প্রচ্ছদসমাজলিখুনফটোকার্ডপথিকটিভিপ্রোফাইল

তোমাকে আমি সত্যরূপে দেখেছি

👁️ 47 ভিউ1 শেয়ার💬 0 মন্তব্য

সন্ধ্যা ধীরে ধীরে রাত্রির অতল গর্ভে অবগাহন করছিল। অস্তগামী সূর্যের শেষ রক্তিম রেখাটুকু পশ্চিমাকাশে কোনো প্রাচীন বিরহের ক্ষতচিহ্নের মতো জেগে ছিল। দূরের বৃক্ষরাজির ওপর নেমে এসেছিল এক অনির্বচনীয় নৈঃশব্দ্য। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতিও তার দৃশ্যমান আবরণ সরিয়ে কোনো গভীর সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ করতে চলেছে।

নদীতীরের নির্জন প্রান্তে দুজন মানুষ মুখোমুখি বসেছিল। বাইরে থেকে তাদের মধ্যে সামান্য দূরত্ব দৃশ্যমান হলেও অন্তর্লোকে তারা যেন একটি অদৃশ্য সেতুর দুই প্রান্ত। তাদের মাঝখানে জমে ছিল বহুদিনের অনুচ্চারিত কথা, অস্বীকৃত ভয়, সংযত কান্না এবং এমন কিছু সত্য, যেগুলো ভাষায় প্রকাশের আগেই মানুষ নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলে।

একসময় মেয়েটি নৈঃশব্দ্যের স্তর ভেঙে জিজ্ঞেস করল,

—তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?

ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। জলের ওপর সন্ধ্যার ম্লান আলো তখন ভেঙে ভেঙে অসংখ্য অনির্ণেয় রেখা তৈরি করছিল। যেন একটি সহজ প্রশ্নের উত্তরও মানুষের অন্তরে এসে কত বিচিত্র অর্থে বিভক্ত হয়ে যায়।

অবশেষে সে বলল,

—জানি না।

মেয়েটির চোখে বিস্ময়ের ছায়া নামল।

—এতদিন আমার পাশে থেকেও তুমি জানো না?

ছেলেটি শান্ত স্বরে বলল,

—ভালোবাসার নাম উচ্চারণ করা সহজ, কিন্তু তার প্রকৃত স্বরূপ জানা কঠিন। মানুষ যাকে ভালোবাসা বলে, তার মধ্যে কতখানি আকাঙ্ক্ষা, কতখানি অধিকারবোধ, কতখানি নিঃসঙ্গতার ভয় আর কতখানি সত্যিকার আত্মসমর্পণ থাকে, তা কি সে নিজেও জানে? তোমাকে হারানোর ভয়কে যদি ভালোবাসা বলে ভুল করি, তবে আমি তোমাকে নয়, নিজের নিরাপত্তাকেই ভালোবাসি।

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল,

—তাহলে সত্যিকার ভালোবাসা কী?

—যেখানে কাউকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে তাকে সত্যরূপে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রবল, সেখানেই ভালোবাসার সূচনা। আর যেখানে তাকে নিজের প্রয়োজনমতো পরিবর্তন না করেও গ্রহণ করা যায়, সেখানে ভালোবাসা পরিণতি লাভ করে। ভালোবাসা অন্য একজন মানুষকে নিজের অনুকূলে নির্মাণ করার শিল্প নয়; বরং তার অনাবৃত অস্তিত্বের সামনে নিজের অহংকারকে নত করার সাধনা।

—অনাবৃত অস্তিত্ব বলতে কী বোঝাচ্ছ?

ছেলেটি এবার মেয়েটির দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কৌতূহল ছিল না, ছিল গভীর অনুসন্ধান।

—সমাজের সামনে তুমি যে মানুষ, পরিবারের কাছে যে মানুষ কিংবা নিজের কাছেও যে রূপে সচরাচর ধরা দাও, শুধু সেই মানুষটি নয়। তোমার সাফল্যের নিচে যে অপূর্ণতা, হাসির অন্তরালে যে বিষণ্নতা, দৃঢ়তার পশ্চাতে যে ভীত শিশু, উচ্চারণের গভীরে যে অনুচ্চারিত আর্তি, সেই সমগ্র সত্তাই তোমার অনাবৃত অস্তিত্ব। মানুষ শরীরকে পোশাকে আচ্ছাদিত করে, কিন্তু আত্মাকে ঢেকে রাখে অহংকার, অভিমান, আত্মপ্রবঞ্চনা ও সামাজিক অভিনয়ের আবরণে। এসব আবরণ একে একে অপসারিত হলে যে নিরলংকার সত্তাটি অবশিষ্ট থাকে, সেটিই মানুষের আধ্যাত্মিক নগ্নতা।

মেয়েটির চোখে তখন প্রশ্নের সঙ্গে সামান্য ভয়ও জমেছিল।

—তাহলে কি ভালোবাসার সামনে সমস্ত গোপনীয়তা বিসর্জন দিতে হয়?

—গোপনীয়তা আর আত্মগোপন এক নয়। মানুষের অন্তর্লোকের কিছু কক্ষ একান্ত ও পবিত্র। সেখানে প্রবেশের অধিকার ভালোবাসার নামেও দাবি করা যায় না। কিন্তু আত্মগোপন হলো প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে নিজের সত্যকে বিকৃত করা। তুমি তোমার কিছু কথা নিজের মধ্যে রাখতেই পারো। কিন্তু আমাকে ধরে রাখার জন্য যদি অন্য একজন মানুষের অভিনয় করো, তবে আমাদের নৈকট্যও এক ধরনের গভীর দূরত্ব হয়ে থাকবে।

মেয়েটি নদীর অন্ধকার জলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

—মানুষ মুখোশ পরে কেন?

—কারণ মানুষ শুধু ভালোবাসা চায় না, ভালোবাসার নিশ্চয়তাও চায়। অথচ সত্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই। মানুষ জানে, নিজের সম্পূর্ণ রূপ প্রকাশ করলে প্রিয়জন হয়তো একদিন চলে যেতে পারে। তাই সে গ্রহণযোগ্যতার একটি প্রতিমূর্তি নির্মাণ করে। তারপর সেই প্রতিমূর্তির আড়ালে বাস করতে করতে একসময় নিজের প্রকৃত মুখটিও ভুলে যায়। পৃথিবীর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে গিয়ে সে নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে ওঠে।

—আমারও কি মুখোশ আছে?

—আছে। যেমন আমারও আছে।

—তুমি কি আমার মুখোশ খুলে দিতে পারবে?

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

—না। অন্যের মুখোশ জোর করে খুলে দেওয়া উন্মোচন নয়, সহিংসতা। আমি কেবল এমন একটি আশ্রয় হতে পারি, যেখানে তুমি নিজেই মুখোশ খুলে রাখার সাহস পাবে। যে ভালোবাসা প্রশ্নের নামে জেরা করে, সে আত্মাকে উন্মুক্ত করে না; তাকে আরও গভীর আত্মগোপনে ঠেলে দেয়। সত্যিকার ভালোবাসা কারও অন্তরের দরজা ভাঙে না। সে দরজার বাইরে একটি প্রদীপ জ্বেলে অপেক্ষা করে।

মেয়েটি ধীর কণ্ঠে বলল,

—যদি আমার ভেতরে এমন অন্ধকার থাকে, যা দেখে তুমি ভয় পাবে?

—তোমার অন্ধকার আমাকে ভয় দেখাতেই পারে। কিন্তু সেই অন্ধকারের জন্য যদি তোমাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করি, তবে আমার ভালোবাসা ছিল শুধু তোমার আলোর প্রতি মোহ। মানুষকে ভালোবাসতে হলে তার দীপ্তির সঙ্গে তার ছায়াকেও স্বীকার করতে হয়। আলো যেখানে জন্ম নেয়, ছায়াও সেখানে অনিবার্য।

একটু থেমে সে আবার বলল,

—তবে গ্রহণ করা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। তোমার ক্ষতকে বুঝতে চেষ্টা করব, কিন্তু সেই ক্ষত দিয়ে আমাকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করার অধিকার তোমাকে দেওয়া যায় না। আধ্যাত্মিক ভালোবাসা আত্মবিসর্জন শেখায়, আত্মবিলোপ নয়।

মেয়েটি প্রশ্ন করল,

—ভালোবাসার মধ্যেও তবে সীমারেখা থাকে?

—থাকে। নদী যেমন তীরের কারণেই নিজস্ব প্রবাহ লাভ করে, ভালোবাসাও মর্যাদার সীমারেখার মধ্যেই গভীরতা পায়। সীমাহীনতার নামে একজন যদি আরেকজনের সত্তাকে গ্রাস করে, তবে সেটি মিলন নয়, বিলুপ্তি। প্রকৃত প্রেমে দুজন মানুষ পরস্পরের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে, কিন্তু কেউ কারও অস্তিত্ব দখল করে না।

—তাহলে আত্মসমর্পণ কী?

—আত্মসমর্পণ মানে নিজের স্বাধীনতা অন্যের হাতে তুলে দেওয়া নয়। আত্মসমর্পণ হলো আত্মরক্ষার সমস্ত বর্ম খুলে বলা, “এই আমি। আমার মধ্যে সৌন্দর্য আছে, অসংগতি আছে, আলো আছে, অন্ধকারও আছে। তুমি আমাকে গ্রহণ করো অথবা প্রত্যাখ্যান করো, কিন্তু তোমাকে ধরে রাখার জন্য আমি আর নিজের সত্যকে অস্বীকার করব না।”

কথাটি বলে ছেলেটি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর বলল,

—অন্যের কাছে নিজেকে সমর্পণের আগে মানুষকে নিজের সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। যে নিজেকেই গ্রহণ করতে পারেনি, সে ভালোবাসার কাছে আসে ভিক্ষুকের মতো। আর যে নিজের অপূর্ণতাকে স্বীকার করতে শিখেছে, সে আসে সহযাত্রীর মতো।

মেয়েটির চোখে তখন এক অজ্ঞাত বেদনা তরল হয়ে উঠছিল।

—আমার কান্না তোমার কাছে কী?

—তোমার কান্না দুর্বলতার জল নয়; সেটি তোমার আত্মার অবরুদ্ধ ভাষা। যে বেদনা দীর্ঘদিন শব্দ খুঁজে পায়নি, অশ্রু তাকে উচ্চারণ করে। তোমার কান্না থামাতে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়লে হয়তো তোমার বেদনাটিই শোনা হবে না। সব কান্না সান্ত্বনা চায় না। কোনো কোনো কান্না কেবল একজন বিশ্বস্ত সাক্ষী চায়।

—আর আমার নীরবতা?

—তোমার নীরবতা যদি কাউকে শাস্তি দেওয়ার অস্ত্র না হয়, তবে তা তোমার অন্তর্লোকের প্রার্থনা। তার অনুবাদ দাবি করা উচিত নয়। শুধু পাশে বসে অপেক্ষা করতে হয়, যতক্ষণ না সেই নৈঃশব্দ্য নিজেই ভাষা হয়ে ওঠে। মানুষের গভীরতম অনুভব প্রায়ই শব্দের কাছে অপমানিত হয়। সেখানে উপস্থিতিই একমাত্র বিশুদ্ধ বাক্য।

রাত্রি তখন আরও ঘন হয়ে এসেছিল। দূরের কোনো অচেনা পাখি অন্ধকারের ভেতর একবার ডেকে আবার স্তব্ধ হয়ে গেল।

মেয়েটি বলল,

—তুমি কি আমাকে সারিয়ে তুলবে?

ছেলেটির কণ্ঠে এবার করুণ কোমলতা নেমে এল।

—কেউ কারও ত্রাণকর্তা নয়। তোমার সমস্ত ভাঙন সারিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ভালোবাসা নয়, অহংকার। তোমার পাশে বসা যায়, তোমার ক্ষতের দিকে ঘৃণা ছাড়া তাকানো যায়, আরোগ্যের পথে তোমার হাত ধরে হাঁটা যায়। কিন্তু তোমার হয়ে তোমার অন্তর্গত পথ অতিক্রম করা যায় না। ভালোবাসা সব ক্ষত সারিয়ে তোলে না; কখনো কখনো সে শুধু ক্ষতটির পাশে একটি কোমল আলো রেখে যায়, যাতে মানুষ অন্ধকারেও নিজের পথ চিনতে পারে।

মেয়েটি জিজ্ঞেস করল,

—তুমি কি আমার অতীত জানতে চাও?

—তোমাকে বিচার করার জন্য নয়। তোমার বর্তমানের ভাষা বোঝার জন্য জানতে চাইতে পারি। তোমার অতীত কোনো আদালতের নথি নয়, সেটি তোমার অস্তিত্বের ভূগোল। সেখানে মরুভূমি আছে, বধ্যভূমি আছে, অরণ্য আছে, হয়তো কয়েকটি গোপন প্রস্রবণও আছে। সেই ভূখণ্ডে বিজেতা হয়ে প্রবেশ করা যায় না; তীর্থযাত্রীর মতো নীরবে হেঁটে যেতে হয়।

—যদি আমার অতীত তোমার ধারণার চেয়ে কলঙ্কিত হয়?

—কলঙ্ক মানুষের ওপর আরোপিত সামাজিক ছায়া। কিন্তু অনুতাপ, উপলব্ধি ও রূপান্তর আত্মার নিজস্ব সত্য। তুমি একদিন কী করেছিলে, সেটিই তোমার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। সেই ঘটনার ভেতর দিয়ে তুমি কী উপলব্ধি করেছ এবং কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছ, সেটিও তোমার পরিচয়ের অংশ। মানুষ তার অতীতের দণ্ডিত বন্দী নয়। সে নিজের চেতনার মধ্যে প্রতিনিয়ত পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে পারে।

মেয়েটি প্রশ্ন করল,

—তুমি কি কখনো আমাকে বিচার করবে না?

—আমি মানুষ। তাই বিচারহীনতার দাবি করলে মিথ্যা বলা হবে। আমার সংস্কার, ভয়, ঈর্ষা কিংবা অহংকার কখনো না কখনো তোমাকে বিচার করতে চাইবে। তবে সেই বিচারকে চূড়ান্ত সত্যের আসনে না বসানোর সাধনা করতে পারি। নিজের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকেই পরম সত্য মনে না করা আধ্যাত্মিক বিনয়ের প্রথম শর্ত। ভালোবাসা বিচারবোধহীন অন্ধত্ব নয়; বিচার জন্ম নেওয়ার পরও করুণাকে বিস্মৃত না হওয়ার সামর্থ্য।

মেয়েটি কিছুক্ষণ ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এমন একটি প্রশ্ন করল, যার উত্তর শোনার ভয় তার নিজেরই ছিল।

—আর যদি কোনো একদিন তোমাকে আর ভালোবাসতে না পারি?

ছেলেটি দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল। আকাশে ততক্ষণে কয়েকটি নক্ষত্র ফুটে উঠেছে। তাদের আলো নদীর জলে এসে ভাঙছিল, অথচ নিভে যাচ্ছিল না।

সে বলল,

—তাহলে সত্যটি বলতে হবে। মিথ্যা ভালোবাসার দীর্ঘ অভিনয়ের চেয়ে সত্য বিচ্ছেদ অনেক বেশি পবিত্র। যে সম্পর্কের প্রাণ শেষ হয়ে গেছে, তাকে সামাজিক ভয় কিংবা অভ্যাসের কৃত্রিম শ্বাসে বাঁচিয়ে রাখা প্রেমের প্রতি অসম্মান। ভালোবাসা যদি সত্য হয়, তার সমাপ্তিও সত্যের মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত।

মেয়েটির কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

—তুমি কি আমাকে চলে যেতে দেবে?

—হৃদয় হয়তো তোমাকে ধরে রাখতে চাইবে। স্মৃতি হয়তো তোমার পদধ্বনিকে বারবার ফিরিয়ে আনতে চাইবে। তবু ভালোবাসার চূড়ান্ত পরীক্ষা অধিকারে নয়, মুক্তিতে। তুমি যদি কাছে থেকে নিজের সত্য হারিয়ে ফেলো, তবে তোমার উপস্থিতি পেয়েও তোমাকে হারাতে হবে। আর দূরে গিয়ে যদি নিজের সত্য ফিরে পাও, তবে বিচ্ছেদের মধ্যেও ভালোবাসা মিথ্যা হবে না।

—প্রেম কি তবে চিরস্থায়ী নয়?

—স্থায়িত্ব সময়ের পরিমাপ, গভীরতা চেতনার। কোনো সম্পর্ক সারাজীবন থেকেও মানুষের আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না। আবার কোনো ক্ষণিক সাক্ষাৎ সমগ্র অস্তিত্বকে রূপান্তরিত করে দিতে পারে। প্রেম কতদিন স্থায়ী হয়েছিল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই প্রেম দুজন মানুষকে কতখানি সত্য করেছিল।

মেয়েটির পরবর্তী প্রশ্নটি আরও গভীর থেকে উঠে এল।

—শরীরের আকাঙ্ক্ষা কি আধ্যাত্মিক প্রেমকে অপবিত্র করে?

ছেলেটি বলল,

—শরীর অপবিত্র নয়। শরীর আত্মার প্রতিপক্ষও নয়; শরীর মানুষের অস্তিত্বের দৃশ্যমান মন্দির। কামনা তখনই অন্ধকার হয়ে ওঠে, যখন তা অন্য মানুষকে ভোগের বস্তুতে পরিণত করে। কিন্তু যে স্পর্শে জবরদখল নয়, সম্মতি আছে; ভোগ নয়, পারস্পরিক সমর্পণ আছে; ক্ষুধা নয়, পরস্পরের অস্তিত্বের প্রতি বিস্ময় আছে, সেই স্পর্শও প্রার্থনা হয়ে উঠতে পারে।

সে মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে আরও বলল,

—আধ্যাত্মিক নগ্নতা শরীরকে অস্বীকার করে না; বরং শরীরের অন্তর্লীন মর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করে। তখন স্পর্শ শুধু ত্বকে ঘটে না, ঘটে বিশ্বাসের গভীরে। দুটি শরীর কাছাকাছি আসার আগেই দুটি আত্মা পরস্পরের কাছে নিরাপদ হয়ে ওঠে।

মেয়েটি মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,

—মানুষ তাহলে কখন সত্যিই নগ্ন হয়?

—মানুষ পোশাকহীন হলে শুধু তার শরীর দৃশ্যমান হয়। কিন্তু যখন সে অহংকার, আত্মপ্রবঞ্চনা, কৃত্রিম দৃঢ়তা, সামাজিক পরিচয় এবং প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় নামিয়ে রাখে, তখন তার অস্তিত্ব দৃশ্যমান হয়।

ছেলেটি ধীর কণ্ঠে বলতে লাগল,

—মানুষ সত্যিই নগ্ন হয়, যখন সে বলতে পারে, “আমি ভয় পাচ্ছি”, “আমি ঈর্ষান্বিত”, “আমি তোমাকে হারানোর আশঙ্কায় অস্থির”, “আমি ভুল করেছি”, “আমি নিজেকেও সব সময় বুঝতে পারি না” কিংবা “আজ আমার কাছে কোনো উত্তর নেই।” এসব স্বীকারোক্তিই আত্মার পোশাক খুলে রাখার শব্দ।

—এই নগ্নতায় কি লজ্জা নেই?

—লজ্জা আছে, কিন্তু অপমান নেই। কম্পন আছে, কিন্তু আত্মঅস্বীকৃতি নেই। আধ্যাত্মিক নগ্নতা নির্লজ্জতা নয়; বরং লজ্জাসহ সত্যের সামনে দাঁড়ানোর সাহস। সেখানে মানুষ নিজেকে প্রদর্শন করে না, সমর্পণ করে। প্রদর্শনের বাসনা দর্শক খোঁজে, আর সমর্পণের আকাঙ্ক্ষা খোঁজে একজন বিশ্বস্ত সাক্ষী।

মেয়েটি বলল,

—তুমি কি আমার সেই সাক্ষী হতে পারবে?

—যদি আমাকে তোমার মালিক না ভাবো, তবে পারি। যদি আমার উপস্থিতিকে তোমার আত্মমূল্যের একমাত্র প্রমাণে পরিণত না করো, তবে পারি। যদি আমিও তোমার সামনে ভেঙে পড়তে পারি, কাঁদতে পারি এবং নিজের অন্ধকার স্বীকার করতে পারি, তবে হয়তো পারি।

একটু থেমে সে যোগ করল,

—একজন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে, আর অন্যজন দুর্ভেদ্য প্রাচীরের আড়াল থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করবে, সেটি অন্তরঙ্গতা নয়। আধ্যাত্মিক নগ্নতা অবশ্যই পারস্পরিক। সেখানে দুজনই সাক্ষী, আবার দুজনই উন্মোচিত।

—তবে কি ভালোবাসা মানুষকে পূর্ণ করে?

—না। দুজন মানুষ যদি পরস্পরকে নিজেদের শূন্যস্থান পূরণের উপকরণ মনে করে, তবে একদিন দুজনই ক্লান্ত হয়ে পড়বে। কেউ কাউকে পূর্ণ করতে পারে না। তারা কেবল পরস্পরকে নিজেদের অসম্পূর্ণতার সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে সাহায্য করতে পারে। প্রেম মানুষকে পূর্ণতা দেয় না; প্রেম তাকে অপূর্ণতার মধ্যেও অখণ্ড হতে শেখায়।

—পূর্ণতা ও অখণ্ডতার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

—পূর্ণতা হলো কিছুই অনুপস্থিত নেই, এমন একটি অলীক ধারণা। অখণ্ডতা হলো নিজের অনুপস্থিতি, ক্ষত, বৈপরীত্য ও অসম্পূর্ণতাসহ সমগ্র অস্তিত্বকে স্বীকার করা। চাঁদের ক্ষয় তাকে চাঁদ হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না। মানুষের ভাঙনও তাকে মানুষ হওয়ার মর্যাদা থেকে বিচ্যুত করে না। যে প্রেম ক্ষয়িষ্ণু অবস্থাতেও মানুষের ভেতরের চাঁদটিকে চিনতে পারে, সে প্রেমই অখণ্ডতার সহযাত্রী।

মেয়েটি বলল,

—তাহলে দুটি মানুষের সম্পর্কের সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্ত কোনটি?

—যে মুহূর্তে তারা পরস্পরকে মুগ্ধ ও প্রভাবিত করার চেষ্টা বন্ধ করে। যখন একজনকে ধরে রাখার জন্য অন্যজনকে কোনো অলংকৃত ব্যক্তিত্ব ধারণ করতে হয় না। যখন তাদের বাক্য ফুরিয়ে যায়, অথচ উপস্থিতি ফুরোয় না। যখন একজন ভেঙে পড়ে এবং অন্যজন তার ভগ্নাংশ জোড়া দেওয়ার আগে সেগুলোর পাশে সম্মানের সঙ্গে বসতে শেখে। যখন একজন বলে, “এই আমার অন্ধকার,” আর অন্যজন অতিরিক্ত আলো জ্বালিয়ে তাকে অন্ধ না করে সেই অন্ধকারে তার হাতটি ধরে রাখে।

মেয়েটি জিজ্ঞেস করল,

—এ কি প্রেম, না সাধনা?

ছেলেটি বলল,

—গভীর প্রেম মাত্রই সাধনা। কারণ সেখানে প্রতিদিন অহংকারের মৃত্যু ঘটে, অধিকারবোধের শুদ্ধি ঘটে এবং ভয় ধীরে ধীরে করুণায় রূপান্তরিত হয়। একজন মানুষ অন্যজনের মাধ্যমে নিজের অচেনা অন্তর্লোকের মুখোমুখি হয়। প্রিয় মানুষ তখন কেবল প্রিয় থাকে না; সে হয়ে ওঠে আয়না, দ্বার এবং কখনো অগ্নি।

—আয়না, দ্বার এবং অগ্নি কেন?

—আয়না, কারণ তার মধ্যে মানুষ নিজেকে দেখতে শেখে। দ্বার, কারণ তার মাধ্যমে নিজের সংকীর্ণ সীমা অতিক্রম করে। আর অগ্নি, কারণ তার সান্নিধ্যে মানুষের মিথ্যা পরিচয়গুলো একে একে দগ্ধ হয়।

—এই সাধনার শেষ কোথায়?

—হয়তো এর কোনো শেষ নেই। মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে, ততদিন নিজের নতুন নতুন স্তর আবিষ্কার করে। আজ যে সত্যে পৌঁছায়, আগামীকাল তার নিচে আরেকটি আবরণ খুঁজে পায়। প্রেম তাই কোনো অর্জিত গন্তব্য নয়; এটি অনন্ত উন্মোচনের যাত্রা। প্রতিদিন প্রিয় মানুষটিকে নতুন করে জানতে হয়, কারণ সে প্রতিদিনই নতুন। নিজেকেও প্রতিদিন নতুনভাবে তার সামনে উপস্থিত করতে হয়, কারণ মানুষ কখনোই সম্পূর্ণভাবে গতকালের মানুষ থাকে না।

রাত্রির অন্ধকার তখন পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে আবৃত করেছে। অথচ সেই অন্ধকারের মধ্যেই তাদের অন্তর্লোক যেন ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছিল।

মেয়েটি জিজ্ঞেস করল,

—এই ভালোবাসার মধ্যে ঈশ্বর কোথায়?

ছেলেটি আকাশের দিকে তাকাল। নক্ষত্রগুলোর দিকে নয়, যেন তাদেরও ঊর্ধ্বে অবস্থিত কোনো অদৃশ্য উপস্থিতির দিকে।

সে বলল,

—যেখানে একজন মানুষ অন্যজনের দুর্বলতা জেনে ক্ষমতাবান হয়ে উঠেও সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে না, সেখানে ঈশ্বর আছেন। যেখানে বিচার করা সম্ভব, অথচ করুণাকে নির্বাচন করা হয়, সেখানে ঈশ্বর আছেন। যেখানে চলে যাওয়ার কারণ থাকা সত্ত্বেও কেউ সত্য ও মর্যাদার সঙ্গে পাশে থাকে, সেখানে ঈশ্বর আছেন। আবার যেখানে থেকে যাওয়া আত্মাকে ধ্বংস করে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সাহসের মধ্যেও ঈশ্বর আছেন।

তারপর সে আরও বলল,

—ঈশ্বর হয়তো শুধু উপাসনালয়ের নিভৃতিতে অবস্থান করেন না। তিনি দুই মানুষের মধ্যবর্তী সেই পবিত্র পরিসরেও বিরাজ করেন, যেখানে কেউ কাউকে নিজের সম্পত্তি মনে করে না, অথচ পরস্পরের অস্তিত্বকে পরম মমতায় ধারণ করে।

মেয়েটি খুব ধীরে বলল,

—তাহলে কাউকে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ কী?

ছেলেটির কণ্ঠ এবার প্রায় নৈঃশব্দ্যের মতো কোমল হয়ে এল।

—কাউকে ভালোবাসা মানে তার সবচেয়ে সুন্দর রূপের মোহে আবদ্ধ থাকা নয়; তার সবচেয়ে সত্য রূপের পাশে জাগ্রত থাকা। তার আলোকিত দিনের উৎসবে যেমন উপস্থিত থাকা, তেমনি তার অন্তর্গত রাত্রিতে একটি নীরব প্রদীপ হয়ে থাকা।

—ভালোবাসা মানে কারও সমস্ত প্রশ্নের উত্তর হয়ে ওঠা নয়; বরং যেসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই, তাদের পাশে তার সঙ্গে বসে থাকা। তাকে নিজের মতো করে পাওয়াও ভালোবাসা নয়; তাকে তার নিজের মতো হয়ে উঠতে দেখা এবং সেই হয়ে ওঠার স্বাধীনতাকে সম্মান করাই ভালোবাসা।

মেয়েটি শেষবারের মতো প্রশ্ন করল,

—যদি কোনো দিন আমি তোমার সামনে আমার সমস্ত আবরণ খুলে দাঁড়াই, আমার ভয়, ক্ষত, অপরাধবোধ, অসম্পূর্ণতা ও অন্ধকারসহ, তখন তুমি কী বলবে?

ছেলেটি তার দুটি হাত নিজের হাতের মধ্যে গ্রহণ করল। সেই স্পর্শে কোনো অধিকার ছিল না, ছিল আশ্বাসের নীরব উষ্ণতা।

সে বলল,

—আমি বলব না, “তুমি নিখুঁত।” কারণ সেটি সত্য হবে না। আমি এ কথাও বলব না যে তোমার অন্ধকার আমাকে ব্যথিত করে না। কারণ সেটিও মিথ্যা হবে।

—আমি শুধু বলব, “আমি তোমাকে দেখছি।”

মেয়েটি নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

ছেলেটি বলতে থাকল,

—আমি তোমার নির্মিত মুখ দেখছি না, তোমার সামাজিক পরিচয় দেখছি না, সৌন্দর্যের সুবিন্যস্ত বহিরাবরণও দেখছি না। এমনকি আমার কল্পনায় নির্মিত তোমাকেও নয়। আমি সেই মানুষটিকে দেখছি, যে ভালোবাসা পেতে চায় অথচ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে কাঁপে; যে আলো কামনা করে, অথচ নিজের অন্ধকার নিয়ে লজ্জিত; যে আশ্রয় খোঁজে, অথচ বারবার আহত হয়ে নিজের অন্তরের দরজা বন্ধ রাখতে শিখেছে।

—আমি তোমাকে উদ্ধার করতে আসিনি। তোমাকে অধিকার করতেও আসিনি। আমি শুধু তোমার সত্যের পাশে আমার সত্যটুকু রেখে দিতে চাই।

তারপর তাদের মধ্যে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। কিন্তু সেই নীরবতা শূন্য ছিল না। সেখানে দুটি আত্মার বহুদিনের গোপন উচ্চারণ একাকার হয়ে ছিল।

সে রাতে তাদের মধ্যে যদি কোনো প্রেম জন্ম নিয়ে থাকে, তবে সেটি সৌন্দর্যের কোনো চুক্তি ছিল না, নিখুঁততার অভিনয় ছিল না, পারস্পরিক শূন্যতা পূরণের আয়োজনও ছিল না। সেটি ছিল দুই অসম্পূর্ণ অথচ জাগ্রত অস্তিত্বের সহযাত্রা।

সেখানে একজন অন্যজনকে নীরবে বলতে পেরেছিল,

“এই আমি, আমার আর কোনো আবরণ নেই।”

আর অপরজন তার সমগ্র উপস্থিতি দিয়ে উত্তর দিয়েছিল,

“আমি তোমাকে তোমার সবচেয়ে সুন্দর রূপে নয়, সবচেয়ে সত্য রূপে দেখেছি। তোমার আলো আমাকে মুগ্ধ করেছে, তোমার অন্ধকার আমাকে প্রশ্ন করেছে, তোমার ক্ষত আমাকে ব্যথিত করেছে, তোমার অসম্পূর্ণতা আমার অহংকার ভেঙে দিয়েছে। তবু আমি এখানে আছি।”

এই থাকা কোনো শৃঙ্খল নয়, কোনো করুণাও নয়। এ এক স্বাধীন, সচেতন ও বিচারহীন উপস্থিতি।

হয়তো এই উপস্থিতিরই অন্য নাম প্রেম।
এই গভীর দর্শনেরই অন্য নাম প্রার্থনা।
এই অহংবিবর্জিত উন্মোচনেরই অন্য নাম আত্মসমর্পণ।
আর এই মুখোশহীন সহাবস্থানের নামই আধ্যাত্মিক নগ্নতা।

রাত্রি ততক্ষণে সম্পূর্ণ নেমে এসেছে। দূরের দৃশ্যগুলো অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেছে। অথচ সেই দুজন মানুষের মধ্যে প্রথমবারের মতো কিছুই আর আড়ালে রইল না।

 

পাঠকের মতামত

মন্তব্য ও আলোচনা

0 মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনার মতামত দিয়ে আলোচনার শুরু করুন।