বাঙালি জাতির অস্তিত্ব কেবল একটি ভাষা, একটি ভূখণ্ড কিংবা একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, ভাষার প্রতি ভালোবাসা, সাম্য ও মানবতার আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতার চেতনা এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। যার মাধ্যমে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালি জাতির স্তম্ভ অর্থাৎ অস্তিত্ব। যার নামকরণ আমরা করতে পারি বাঙালি জাতির ‘অস্তিত্ব স্তম্ভ’। এই অস্তিত্ব স্তম্ভটিকে যদি উপরে তুলে ধরে রাখতে চাই তাহলে প্রয়োজন তিনটি শক্ত খুঁটি বা ভীতের। যে খুঁটি তিনটি নিয়ে বিগত দেড়যুগ যাবৎ আমার অসংখ্য বক্তৃতা-বিবৃতিতে উল্লেখ করেছি। এই ভীত তিনটি নিয়েই আমার এই নিবন্ধের আলোচনা। যে আলোচনার মাধ্যমে ভীত তিনটির পরিচয়ও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠবে সকলের কাছে। স্তম্ভটিকে যদি বাঙালি জাতি ও তাদের চেতনার (অস্তিত্ব) সাথে তুলনা করা হয় তাহলে, প্রথম খুঁটিটি হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তাঁর লেখালেখির মাধ্যমে নোবেল জয় করে বিশ্ববাসীকে বাঙালি জাতি ও তাদের চেতনার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় খুঁটিটি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তাঁর লেখালেখির দ্বারা জানিয়েছেন যে-এ জাতিটি বিজাতীয় শাসকদের দ্বারা শোষিত ও বঞ্চিত। আর তৃতীয় খুঁটিটি হলো হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে বাঙালি আর পরাধীন নয়।
কোনো একটি স্তম্ভকে যেমন কমপক্ষে তিনটি খুঁটি ছাড়া তুলে ধরে রাখা সম্ভব নয় তেমনি উপরোল্লিখিত স্তম্ভটিকেও উক্ত তিনটি খুঁটির যে কোনো একটিকে ছাড়া তুলে ধরে রাখা সম্ভব নয়। এই জাতীয় পরিচয় নির্মাণে তিনটি ভিন্ন সময়ে, তিনটি ভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁদের অবদানকে প্রতীকীভাবে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়-রবীন্দ্রনাথ বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছেন, নজরুল সেই পরিচয়ে বিদ্রোহ, সাম্য ও মুক্তির চেতনা সঞ্চার করেছেন আর বঙ্গবন্ধু বাঙালির জাতীয় আত্মপরিচয়কে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এটি তাঁদের ভূমিকার একটি বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা থেকে প্রতীয়মান হবে। যদিও তিনজনের কাজের ক্ষেত্র অবশ্যই আরও বিস্তৃত।
ভীত বা খুঁটি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) নম্বরÑ১: বহু প্রতিভার অধিকারী বিশ^ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আলোয় উদ্ভাসিত করে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন বিশ্ব দরবারে। পেয়েছেন বিশ্বকবির সম্মান। তিনি বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনেক কিছুরই প্রথম রূপকার তিনি। তাঁর হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সৃষ্টি হয়। বাংলা গদ্যের আধুনিকায়নের পথিকৃৎ ও ছোটগল্পের জনকও তিনি। গল্প, উপন্যাস, কবিতা ছাড়াও বিচিত্র গানের বাণী, সমৃদ্ধ প্রবন্ধ, এমনকি চিত্রকলায়ও তিনি চির নবীন-চির অমর। বাঙালির যাপিত জীবনাচরণের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও নাটক অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি চিরস্মরণীয় আছেন মানুষের হৃদয়ে।
বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে এক হাজার বছর এগিয়ে নেবার কৃতিত্ব তাঁরই। এ মহান কবিকে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এশিয়ার বিদগ্ধ ও বরেণ্য ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করেন।
যুগে যুগে পৃথিবীতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে রূপান্তর ঘটেছে, রবীন্দ্রনাথ সবকিছুকেই আত্মস্থ করেছেন গভীর অনুশীলন, ক্রমাগত নিরীক্ষা এবং বিশ্বপরিক্রমার মধ্যদিয়ে। তাই তাঁর সাহিত্যজীবনের নানা পর্যায়ে বিষয় ও আঙ্গিকের নিরন্তর পালাবদল লক্ষণীয়। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল তাঁর অসংখ্য কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, ভ্রমণকাহিনী, চিঠিপত্র এবং দেশে বিদেশে প্রদত্ত বক্তৃতামালা।
বাংলা সাহিত্যের অসামান্য প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ বাংলা সনের ২৫ বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৬১ সালের ৭ মে) পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার জোডাসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মা সারদাসুন্দরী দেবী। বিশ্বকবি বর্ষা ঋতুকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। এই ঋতু নিয়ে তার অসংখ্য কবিতা, গান, ছোটগল্প, প্রবন্ধ রয়েছে। সেই বর্ষাতেই বাংলা ১৩৪৮ সনের ২২ শ্রাবণ কলকাতায় পৈতৃক বাসভবনে অমৃত আলোকের নতুন দেশে পাড়ি দিলেন কবি। কবির পূর্বপুরুষরা খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগে বসবাস করতেন।
১৮৭৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিকাহিনী’ প্রকাশিত হয়। এ সময় থেকেই কবির বিভিন্ন ঘরানার লেখা দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘গীতাঞ্জলী’ কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথের লেখার প্রধান উপজীব্য ছিল জীবনানুভূতি যেখানে বাঙালির জাতিসত্তা, আশা-আকাঙ্ক্ষা-নিরাশার আবেদনগুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এটি এমন প্রবলভাবে এসেছে যে তিনিই হয়ে উঠেছেন বাঙালির জাতিসত্তা ও বোধের এক অপার আধার।
বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের নির্মাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিক্ষা, দর্শন ও মানবতাবোধকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে বিশ্বপরিসরে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে।
ক. বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করা: রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও গানে নতুন মাত্রা যোগ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে বাঙালির প্রকৃতি, প্রেম, বিরহ, গ্রামীণ জীবন, সামাজিক সংকট, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান ও মানবিক সম্পর্ক গভীরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সাহিত্য বাঙালিকে শুধু নিজের জীবন চিনতে শেখায়নি, নিজের ভাষার সৌন্দর্য ও প্রকাশক্ষমতা সম্পর্কেও সচেতন করেছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি-র ইংরেজি অনুবাদের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেন।
খ. বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐক্য ও আত্মমর্যাদা: রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা ও সাহিত্য ধর্মীয় কিংবা সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীন চিন্তা ও সম্প্রীতির কথা বলে। তাঁর রচনায় বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বরূপ যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি বিশ্বমানবতার সঙ্গে তার সংযোগও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি রাখিবন্ধন উৎসব ও গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উদ্যোগের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের আহ্বান জানায়।
গ. জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে স্থায়ী অবদান: বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ রবীন্দ্রনাথের রচনা। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গান বাংলাদেশের মানুষের কাছে মাতৃভূমির প্রকৃতি, মমতা ও দেশপ্রেমের এক গভীর প্রতীক হয়ে উঠেছে। এখানে রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো, তাঁর সৃষ্ট একটি গান স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েছে। মোটকথা: রবীন্দ্রনাথ বাঙালিকে তার ভাষা, সাহিত্য, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নিজেকে চিনতে এবং বিশ্বসভায় নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরতে সাহায্য করেছেন।
ভীত বা খুঁটি (নজরুল ইসলাম) নম্বরÑ২: বিংশ শতাব্দির বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তাঁর অসংখ্য কবিতায় এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ, ধুমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। এক সময় ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী ও ভাঙার গানের মতো কবিতা; ধুমকেতুর মতো সাময়িকী। জেলে বন্দী হলে পর লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী, এই সব সাহিত্যকর্মে সা¤্রাজ্যবাদের বিরোধীতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মানবতাবোধ, সাম্যবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন প্রচুর। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। সেটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামা সংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন এবং সেগুলির সুরারোপ করেছেন, যেগুলি এখন নজরুল সঙ্গীত বা নজরুল গীতি নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী কবিতার জন্যই ‘ত্রিশোত্তর আধুনিক কবিতা‘র সৃষ্টি সহজতর হয়েছিল বলে মনে করা হয়। নজরুল তাঁর সাহিত্যকর্ম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলায় পরাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সা¤্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, মৌলবাদ এবং দেশি-বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এ কারণে ইংরেজ সরকার তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ ও পত্রিকা নিষিদ্ধ করে এবং তাঁকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী, উদ্দীপ্ত যৌবনের কবি কাজি নজরুল ইসলাম। ধুমকেতুর মহাবিস্ময় নিয়ে যিনি প্রবল আলোড়ন তুলেছেন বাংলার সাহিত্যাকাশে। স্বদেশপ্রেমের, জাগরণের ও উজ্জীবনের কবি নজরুল। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পূজারি ছিলেন তিনি। তাঁর সাধনা ছিল মানবতার কল্যাণ ও মুক্তি। তিনি যে সময়ে জন্মেছিলেন, যে সময়ে তাঁর বেড়ে ওঠা তখন সময়টা ছিল বড় বিচিত্র। প্রথম বিশ^যুদ্ধ, স্বদেশী আন্দোলন, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী চেতনার স্ফুরণ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে আর্থ-সামাজিক অবস্থা ছিল চরম অস্থিরতায় পূর্ণ। এসব ঘটনা-আন্দোলনের মধ্যে কবির মানসচেতনায় অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যবাদী চেতনার জন্ম হয়। অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব নজরুল। ব্রিটিশ ভারতের শ্রেণিখণ্ডিত, ধর্মবিচ্ছিন্ন এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে সমাচ্ছন্ন বহুধাবিভক্ত সমাজে জন্মগ্রহণ করেও নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত অসাম্প্রদায়িক লেখক। বহু পথ ও মতে আবর্তিত হয়ে ঔচিত্যবোধের আলোকে সমাজের অনগ্রসরতা ও পশ্চাৎদতা প্রত্যক্ষ করে নজরুল ক্ষতবিক্ষত ও মর্মহত হয়েছেন। তিনি এই উপলদ্ধিতে স্নাত হয়েছেন যে ভারতবর্ষের প্রকৃত মুক্তি ও মানবতার বিকাশের জন্য প্রয়োজন সাম্প্রদায়িকতার বিলোপ এবং হিন্দু-মুসলমানের সত্যিকার মিলন। তারই আদর্শে উজ্জীবিত তিনি স্বাভাবিক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হিন্দু-মুসলমানের মিলনের গান গেয়েছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন এবং তাদের ঐক্যের ব্যগ্রতায় হয়েছেন সর্বদা তৎপর ও উচ্চকিত। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর অসাম্প্রদায়িক মৈত্রীকামী চেতনা জীবনের প্রারম্ভ থেকেই সক্রিয় ছিল। কবি নজরুল সারা জীবন প্রায় সতর্কভাবেই চেতনায়, চিন্তায়, কাথায়, কাজে ও আচরণে এ অসাম্প্রদায়িকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন।
বাঙালির বিদ্রোহ, সাম্য ও মুক্তিচেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহ, মানবমুক্তি, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও আত্মমর্যাদার এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তিনি বাঙালির জাতীয় সত্তাকে শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহসও দিয়েছেন।
ক. ঔপনিবেশিক শাসন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ: নজরুলের বিখ্যাত কবিতা বিদ্রোহী বাংলা সাহিত্যে প্রতিবাদী চেতনার এক অনন্য প্রকাশ। তাঁর কবিতা ও গান পরাধীনতা, শোষণ, নিপীড়ন এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করেছে। তাঁর সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকা ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক চেতনা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। তাঁর লেখার কারণে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার তাঁকে কারাবন্দী করে। তাঁর সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকা ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক চেতনা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। তাঁর লেখার কারণে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার তাঁকে কারাবন্দী করে। নজরুলের বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে ছিল না; তা ছিল মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্য, কুসংস্কার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধেও।
খ. সাম্য ও মানবমর্যাদার প্রতিষ্ঠা: নজরুল এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হবে তার মানবিক মর্যাদায়, ধর্ম, জাত, শ্রেণি কিংবা সামাজিক অবস্থানে নয়। তাঁর সাম্যবাদী, মানুষ ও নারী কবিতায় মানুষের সমান মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় এবং নারী-পুরুষের সমঅধিকারের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। এই চিন্তা বাঙালির জাতীয় পরিচয়কে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে-যেখানে জাতীয়তাবাদ মানে কেবল একটি জনগোষ্ঠীর গৌরব নয়, বরং সকল মানুষের অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি।
গ. অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়: নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতে ইসলামি ঐতিহ্য, হিন্দু পুরাণ, শ্যামাসংগীত, গজল ও বাংলা লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটেছে। তিনি দেখিয়েছেন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শক্তি হতে পারে। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি বাঙালির এমন এক পরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণে সহায়তা করেছে, যেখানে ধর্মীয় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ একটি অভিন্ন ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হতে পারে। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি বাঙালির এমন এক পরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণে সহায়তা করেছে, যেখানে ধর্মীয় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ একটি অভিন্ন ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হতে পারে। মোটকথা রবীন্দ্রনাথ বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করলে নজরুল সেই পরিচয়ের মধ্যে প্রতিবাদ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে প্রবলভাবে উচ্চারিত করেছেন।
ভীত বা খুঁটি (বঙ্গবন্ধু) নম্বরÑ৩: এই পৃথিবীর প্রত্যেক জাতিরই কিছু না কিছু ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐহিত্যও সুপ্রাচীন। ইতিহাস ঐতিহ্যকে গতিশীল ও সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য, একটা জাতিকে অন্য জাতির শাসন-শোষণ, নিপীড়ন-নির্যাতন ও বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যুগে যুগে স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন বিভিন্ন মানব মহামানব। বাঙালি অধ্যুষিত এই জনপদেও যুগে যুগে জন্মলাভ করেছেন অনেক মনীষী দেশপ্রেমিক। কিছু সংখ্যক নির্দিষ্ট মানুষের শ্রম-ঘাম-রক্ত-মেধা-দক্ষতা ও পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে বাঙালি জাতির সুনির্দিষ্ট আবাসভূমি গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন বাংলাদেশ। তিতুমীর , ঈশা খাঁ, প্রীতিলতা, বাঘা যতিন, মাস্টার দা সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, শেরেবাংলা, ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিব, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল সহ. আরও কত শতজন। এই সমস্ত শ্রেষ্ঠ মানব মানবীর মধ্য হতে বিশেষ একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জাতির জনক। একটা কিংবদন্তি, একটা মাইলফলক, একটা ইতিহাস, একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি। তিনি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। যার কথা মনে আসলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে বেক ব্রাশ চুলের একটা অনবদ্য বলিষ্ঠ মুখচ্ছবি, যেন একটা দেশ, একটা মানচিত্র, একটা ভূ-খন্ড। সে মানুষটির নামই শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের মানুষ যাকে ভালবাসা আর শ্রদ্ধায় অভিষিক্ত করেছেন বঙ্গবন্ধু নামে। বাঙালি জাতির ইতিহাস ঐতিহ্যের এ দীর্ঘ পরিক্রমা ও ত্যাগ তিতিক্ষা এবং জেল-জুলুম-নির্যাতনের মধ্য দিয়ে, ৫২, ৬২, ৬৫, ৬৯, ৭০, ৭১ সহ শত সংগ্রামের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থেকে জনগণের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন তাদের অবিসংবাদী নেতা। জনগণের সঙ্গে তাঁর ছিল নাড়ীর টান, তাদের হৃদয় তন্ত্রীর সুর ধ্বনিত হত তাঁর নিজের হৃদয়ে। তিনি তাদের অন্তরের আবেগ ও ভাষা বুঝতেন। সে জন্যই তিনি তাদের মাঝে থেকেই হয়ে উঠেছেন তাদের শ্রদ্ধেয় নেতা। তাদের চালিত করেছেন সূর্যোদয়ের পথে, মুক্তির পথে। যার ফলশ্রুতিতে তাঁর ডাকে সারা দিয়ে এ দেশের আপামর জনতা একাত্মতা ঘোষণা করেছেন তাঁর সাথে। এবং তাঁর যোগ্য নেতৃত্ব, ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্তের বিনিময়ে দু’লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জন করেছেন একটা স্বধীন দেশ।
বাঙালির রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন এক নেতা, যাঁর নেতৃত্বে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অধিকার ও রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একত্রিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল মূলত সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিন্তার জগতে জাতীয় চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছেন; বঙ্গবন্ধুর প্রধান ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল সেই জাতীয় চেতনাকে গণরাজনীতি ও স্বাধীনতার আন্দোলনে সংগঠিত করা। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল মূলত সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিন্তার জগতে জাতীয় চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছেন; বঙ্গবন্ধুর প্রধান ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল সেই জাতীয় চেতনাকে গণরাজনীতি ও স্বাধীনতার আন্দোলনে সংগঠিত করা।
ক. ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অধিকার: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে বিরোধ ক্রমে তীব্র হয়। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনার বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু ভাষার অধিকারসহ পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিগুলো বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ পায়। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর উত্থাপিত ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংগঠিত রূপ দেয়। এর মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ফেডারেল শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা আরও সুস্পষ্ট হয়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় সংকট গভীর হয়। এই ধারাবাহিকতা বাঙালির জাতীয় আত্মপরিচয়কে গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে।
খ. ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম: ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ মুক্তিকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ঐক্যবদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাষণটিতে তিনি রাজনৈতিক অধিকার, মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের দিকনির্দেশনা দেন। ২৫ মার্চের সামরিক অভিযানের পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে যুক্ত। তাঁর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পূর্ববর্তী গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৭১ সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই সংগ্রাম ছিল বহু মানুষের অংশগ্রহণ, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ এবং দেশ-বিদেশের নানা সহায়তার সম্মিলিত ইতিহাস।
গ. স্বাধীন রাষ্ট্রে জাতীয় পরিচয়ের রূপায়ণ: স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাথমিক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা ভাষা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং বাঙালির রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে ওঠে। তবে বাংলাদেশের পরিচয়কে বুঝতে হলে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি নাগরিকত্ব, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সংবিধানে স্বীকৃত অধিকারগুলোকেও বিবেচনায় রাখতে হয়। মোটকথা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অবদান হলো বাঙালির জাতীয় চেতনাকে রাজনৈতিক অধিকার ও গণআন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সংগঠিত করা।
উল্লেখিত এই তিনজনের অবদানের কথা সংক্ষিপ্তভাবে বললে: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়। প্রধান ক্ষেত্র: সাহিত্য, সংগীত, শিক্ষা ও মানবতাবাদ। বাঙালিকে তার ভাষা, প্রকৃতি, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীরতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছেন। তাঁর রচনা বাঙালির আত্মপরিচয়কে বিশ্বসাহিত্যের পরিসরে পৌঁছে দিয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলাম: মুক্তি ও সাম্যের চেতনা। প্রধান ক্ষেত্র: বিদ্রোহী সাহিত্য, মানবমুক্তি ও অসাম্প্রদায়িকতা বাঙালির আত্মমর্যাদা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সামাজিক সাম্য এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করেছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতা। প্রধান ক্ষেত্র: গণআন্দোলন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ দিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে যে বিষয়গুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে-বাঙালি জাতির অস্তিত্ব গঠনে তাঁদের সম্মিলিত তাৎপর্য: এই তিনজনের অবদানকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে বাঙালি জাতিসত্তার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা স্পষ্ট হয়। ১. সাংস্কৃতিক পরিচয়: আমরা কারা, আমাদের ভাষা ও ঐতিহ্য কী-রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত এসব প্রশ্নের গভীর উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে। ২. নৈতিক ও সামাজিক চেতনা: আমরা কেমন সমাজ চাই, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কীভাবে দাঁড়াব-নজরুলের সাহিত্য এসব প্রশ্নে প্রতিবাদী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। এবং ৩. রাজনৈতিক পরিচয়: আমরা কীভাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়েছি-বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এ প্রশ্নের উত্তর দেয়। অবশ্য বাঙালি জাতিসত্তা কেবল এই তিনজনের অবদানে গঠিত হয়নি। ভাষা আন্দোলনের শহীদ, কৃষক-শ্রমিক, লেখক-শিল্পী, রাজনৈতিক কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষের অবদানও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও বঙ্গবন্ধুকে একই ঐতিহাসিক ধারায় বিচার করার অর্থ তাঁদের অবদানকে এক করে ফেলা নয়; বরং তাঁদের স্বতন্ত্র ভূমিকা কীভাবে বাঙালির আত্মপরিচয়ের বিভিন্ন মাত্রাকে সমৃদ্ধ করেছে, তা উপলব্ধি করা।
মোটকথা রবীন্দ্রনাথ বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নজরুল সেই পরিচয়ে সাম্য, বিদ্রোহ ও মানবমুক্তির শক্তি সঞ্চার করেছেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একটি বাক্যে তাঁদের অবদানকে এভাবে প্রকাশ করা যায়: রবীন্দ্রনাথ বাঙালিকে তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গভীরতা চিনিয়েছেন, নজরুল সেই আত্মপরিচয়কে মুক্তি ও সাম্যের চেতনায় উজ্জীবিত করেছেন, আর বঙ্গবন্ধু সেই জাতীয় চেতনাকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সংগঠিত করেছেন। তিনটি ভূমিকা বাঙালির ইতিহাসের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা-সংস্কৃতি, চেতনা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম-বুঝতে সহায়তা করেছে। অর্থাৎ বাঙালির অস্তিত্ব উল্লেখিত তিনটি খুঁটি বা ভীতের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যাঁদের যে কোনো একটিকে বাদ দিতে চাওয়ার অর্থই বাঙালির অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।





মন্তব্য ও আলোচনা