জন্মের বহু পূর্বেই আত্মাকে ডাকা হয়েছিল এক গোপন সভায়। আলোর অতল সাগরে, যেখানে সময় আর স্থান ছিল না, সেখানে স্রষ্টা প্রশ্ন করেছিলেন—
“ألست بربكم؟”
— আমি কি তোমাদের রব নই?”— [সূরা আরাফ, ৭:১৭২]
আর আত্মারা সমস্বরে বলেছিল— “বল, নিশ্চয়ই হ্যাঁ! আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছিÑ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।”
সেই দিনই আত্মার বুকে লেখা হয়েছিল— তার অস্তিত্ব কেবল এক চুক্তির উপর গড়া। এক ভালোবাসার চুক্তি, যেখানে প্রেমিক হচ্ছে আত্মা, প্রেম হচ্ছে জীবন, আর প্রেমাস্পদ হচ্ছেন স্বয়ং স্রষ্টা।
তখন আত্মা ছিলো মুক্ত। কোনো দেহের খাঁচায় নয়, সে ছিলো এক বাক্সে, যেখানে লেখা ছিল— তার নাম, তার প্রেম, তার গন্তব্য। সেই বাক্সকেই বলে— লওহে মাহফুজ।
প্রেমের জন্য পূর্ব নির্ধারিত লেখা, একদিন সে নিজেকে ভুলে যাবে, কাঁদবে, ধ্যান করবে, আর শেষত আল্লাহর প্রেমে বিলীন হয়ে যাবে।”
তুমি যদি কোনোদিন অকারণে কাঁদো, যদি রাতের গভীরে হঠাৎ বুক ভার হয়ে আসে,
তবে জেনে রেখো— তোমার আত্মার মাহফুজে প্রেমের সেই বাক্য লেখা আছে।
এ জগতে কেউই হঠাৎ ভালোবাসতে শেখে না। ভালোবাসা হলো—প্রতিজ্ঞার জাগরণ। এক চিরন্তন স্মৃতির আলোকপাত।
যখন পৃথিবী ভুলিয়ে দেয়, আত্মা মনে করায়, দেহ যখন পৃথিবীতে নামে, সে ভুলে যায়— কোথা থেকে এসেছে, কিসের জন্য এসেছে।
তখন শুরু হয় ব্যস্ততা, অহংকার, দম্ভ। কিন্তু আত্মা নীরব থেকে অপেক্ষা করে— একদিন তার ভিতরের বাক্স খুলবে।
হয়তো তা খুলবে প্রেমে আঘাত পেয়ে, হয়তো প্রার্থনার মাঝখানে, বা কোনো কাফেরের চোখের জল দেখে।
আর যখন সেই বাক্স খুলে যায়, তখন দেহ থেমে যায়, আর আত্মা উচ্চারণ করে— “আমার সৃষ্টি তো তোমার জন্যই ছিল!”
একজন সত্যিকারের প্রেমিক যখন নিজের আত্মার মাহফুজ পড়তে পারে, সে দেখে—তার নামের পাশে এক নাম লেখা— আল্লাহ।
এই নাম কেবল উচ্চারণের জন্য নয়। এই নাম বসে থাকে রক্তে, ঘুমিয়ে থাকে প্রতিটি ধমনীতে।
তখন প্রেমিক ভাবে— “আমি তো তারই ছিলাম। আমি তো আমার ছিলামই না।
আমার সব আর্তি, কবিতা, গান, কান্না— সবই তো তার পানে যাওয়ার পথ ছিল।”
আল্লাহ যাকে চায়, তাকে তার মাহফুজ পড়তে দেয়Ñ সবাই নিজের আত্মার মাহফুজ দেখতে পায় না। কেউ জন্মেই হারিয়ে যায় দুনিয়ার কোলাহলে।
কিন্তু কিছু আত্মা থাকে— যাদের আল্লাহ নিজেই ডাক দেন। তারা কোনোদিন অসহায় ভালোবাসা দেখে কেঁদে ফেলে, অথবা গাছের পাতায় রোদের ঝিলিক দেখে আত্মা কেঁপে ওঠে।
সেই কাঁপুনিই ইশারা— তোমার মাহফুজের দরজা খুলে গেছে। আর সেই দরজা দিয়ে শুধু প্রেম প্রবাহিত হয়, আর আসে সেই চিরন্তন বাক্য— “তুমি আমার, আমি তোমার।”
যে আত্মা প্রেমে পড়ে, সে পূর্ব-লিখিত নামে জেগে ওঠে “অন্তরে যে প্রেম জাগে তা নতুন নয়, সে প্রেম আদিতে লেখা ছিল। তুমি এখন কেবল তা মনে করছো।” আত্মা যখন প্রেমে পড়ে, তখন তার হৃদয় থেকে শেকল পড়ে যায়।
সে আর নিজের নাম ধরে ডাকে না। সে চায় একটাই—নিজেকে বিলিয়ে দিতে,
যেন নিজের নাম ভুলে গিয়ে ঈশ্বরের নামে মিলিয়ে যায়। এখানেই ফানা শুরু হয়। এখানেই “আমি” শব্দটি হারিয়ে যায়।
যদি কখনো এমন মনে হয়— তোমার ভিতর থেকে শব্দ উঠছে—“ হে প্রভু, তুমি ছাড়া কেউ আমার নয়” তবে বুঝে নিও—তুমি ফিরে যাচ্ছো তোমার মাহফুজে লেখা নামের দিকে।
তুমি বুঝবে—তোমার কষ্ট, তোমার প্রেম, তোমার নিঃসঙ্গতা—সবই পরিকল্পিত।
কারণ লওহে মাহফুজে লেখা আছে— তুমি প্রেমিক হবে, আর প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে ঈশ্বরের দিকে ফিরে যাবে।






মন্তব্য ও আলোচনা