একদিন তোমার দিকে যাওয়ার একটি পথ ছিল।পথটির দুপাশে কোনো দৃশ্যমান ফুল ছিল না, তবু আমার মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত বসন্ত বুঝি সেখানে এসে গোপনে আশ্রয় নিয়েছে। তোমার দিকে কয়েক পা এগোলেই বাতাস বদলে যেত, সন্ধ্যার রং আরও কোমল হতো, আর দূরের নক্ষত্রগুলোকে মনে হতো আমাদেরই কোনো অনাগত জীবনের প্রদীপ।
সেই পথ আজ আর নেই। তার মাঝখানে কবে যে একটি পাহাড় জন্ম নিল, আমি টের পাইনি। প্রথমে ছিল সামান্য অভিমান, তারপর কিছু অনুচ্চারিত বেদনা, কয়েকটি নিষ্ঠুর বাক্য, কিছু অবিশ্বাস, কিছু অপমান। দিনের পর দিন তারা পাথর হয়ে জমেছে। আজ তাকিয়ে দেখি, আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক দুর্লঙ্ঘ্য ঘৃণার পাহাড়।
পাহাড়টি এত উঁচু যে তার ওপারে তোমাকে আর দেখা যায় না। এত অন্ধকার যে তোমার কাছে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে পাওয়ার সাধ্যও আমার আর নেই।
অথচ একদিন কী প্রবল আকাঙ্ক্ষায় তোমার কাছে ফিরে যেতাম! ভাবতাম, মানুষের ভুলের চেয়েও ভালোবাসা বড়; অভিমানের চেয়েও মায়া দীর্ঘ; সমস্ত ভাঙনের পরও কোথাও একটি দরজা খোলা থাকে, যার নাম ক্ষমা। ভুল ভেবেছিলাম।
এখন পাহাড়ের ওপারে পড়ে থাক তোমার নগর। সেখানে তোমার কুৎসিত ভাবনাগুলো অট্টালিকা হয়ে উঠুক, অবিশ্বাসেরা জানালা খুলে বসে থাকুক, অহংকারের কালো পাখিরা উড়ে বেড়াক ছাদের ওপর। যে অন্ধকার তুমি নিজের হাতে নির্মাণ করেছ, সেই অন্ধকারেই একদিন তুমি তোমার মুখ চিনে নিও। আমি আর সেখানে ফিরব না। কোনো অভিযোগ নিয়েও নয়, প্রতিশোধ নিয়েও নয়।
মানুষ একসময় অভিযোগ করাও ছেড়ে দেয়। কারণ অভিযোগেরও একটি গোপন প্রত্যাশা থাকে। যার কাছে আর কিছু প্রত্যাশা নেই, তার বিরুদ্ধে অভিযোগও একসময় অর্থহীন হয়ে যায়।
তাই তোমাকে আমি আমার সমস্ত প্রশ্ন থেকে মুক্ত করে দিলাম। শুধু এপারে একটি নদী রেখে দিলাম। ঘৃণার নদী। সে নদী আমার বুকের মধ্য দিয়ে নিঃশব্দে বয়ে যাবে। তার জল কালো নয়, বরং আশ্চর্য স্বচ্ছ। এতটাই স্বচ্ছ যে তার তলদেশে তাকালে আজও দেখা যায় আমাদের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো। দেখা যায় একটি মানুষ কী অপরিসীম বিশ্বাস নিয়ে আরেকটি মানুষের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। দেখা যায়, দুটি হাত একদিন পৃথিবীর সমস্ত বিচ্ছেদকে অস্বীকার করে পাশাপাশি থাকার স্বপ্ন দেখেছিল।
এই জন্যই নদীটির দিকে তাকাতে আমার ভয় হয়। কারণ আমি জানি তার জন্ম ঘৃণায় নয়। তার উৎসে ছিল ভালোবাসা। এক অনুপম, নির্বোধ, সর্বস্ব সমর্পণ করা ভালোবাসা।
তোমাকে যতটা আপন ভেবেছিলাম, পৃথিবীতে আর কাউকে ততটা দূরের মানুষ হয়ে যেতে দেখিনি। সম্ভবত গভীর ভালোবাসার এটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরিণতি: যে মানুষটি একদিন হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের ঠিকানা ছিল, একসময় তার কাছেই পৌঁছাতে মাঝখানে একটি সম্পূর্ণ পাহাড় দাঁড়িয়ে যায়।
এখন সেই পাহাড় অতিক্রম করার শক্তি আমার নেই। ইচ্ছেও নেই। তুমি পাহাড়ের ওপারে থেকে যাও। তোমার নগরে রাত নামুক। তোমার জানালায় বাতাস আসুক। কোনো এক গভীর মধ্যরাতে যদি হঠাৎ মনে পড়ে, এই পৃথিবীতে একজন মানুষ ছিল যে তোমাকে নিজের চেয়েও অধিক বিশ্বাস করেছিল, তখন জানালা খুলে দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ো। হয়তো কিছুই দেখতে পাবে না।
শুধু খুব মন দিয়ে শুনলে একটি নদীর শব্দ শুনতে পাবে। সে আমার ঘৃণার নদী।অনেক দিন আমি ভেবেছিলাম, এই নদীই বুঝি আমার শেষ ঠিকানা। বাকি জীবন এর তীরেই বসে তোমাকে ঘৃণা করে যাব। তোমার দেওয়া ক্ষতগুলোকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখব, যেন প্রতিটি ক্ষত সাক্ষ্য দেয় তুমি একদিন আমার সঙ্গে কী করেছিলে। কিন্তু এক ভোরে অদ্ভুত একটি ঘটনা ঘটল। ঘুম ভেঙে দেখি নদীর ওপরে কুয়াশা নেই। বহুদিন পর পূর্ব আকাশে আলো উঠেছে।
আমি নদীর জলে মুখ দেখতে গিয়ে চমকে উঠলাম। সেখানে তোমার ছায়া নেই। তোমার চলে যাওয়া নেই। তোমার দেওয়া অপমানও নেই।
সেখানে শুধু আমি। দীর্ঘদিন পর নিজেকে দেখতে পেলাম। তখনই বুঝলাম, তোমাকে ঘৃণা করতে করতে আমিও এতকাল তোমাকেই বহন করে চলেছি। ভালোবাসার সময়ে তুমি ছিলে আমার হৃদয়ে; ঘৃণার সময়েও তুমি সেখানেই থেকে গিয়েছিলে, শুধু তোমার নাম বদলে গিয়েছিল।
কী আশ্চর্য! আমি যাকে নির্বাসন দিয়েছিলাম, তাকেই নিজের ঘৃণার মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে রেখেছিলাম। সেদিন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে প্রথমবার হাসলাম। তোমাকে ক্ষমা করে নয়।তোমার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্যও নয়। নিজেকে মুক্ত করার জন্য। কারণ ক্ষমা মানেই ফিরে যাওয়া নয়; কিছু ক্ষমা কেবল নিজের হৃদয়ের দরজা খুলে দিয়ে অতীতকে বাইরে চলে যেতে দেওয়া। আমি তাই নদীটিকেও আর ঘৃণার নদী বললাম না।
তার কোনো নাম রাখলাম না। সে বয়ে গেল। পাহাড় রয়ে গেল। তোমার নগরও রয়ে গেল পাহাড়ের ওপারে। শুধু আমি আর দাঁড়িয়ে রইলাম না। আমি উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
দেখলাম, যে পথটিকে এতদিন পৃথিবীর শেষ পথ বলে ভেবেছিলাম, তার পরেও পথ আছে। পাহাড়ের এপারেও বসন্ত আসে। অচেনা গাছে ফুল ফোটে। মানুষের হৃদয় ভেঙে যাওয়ার পরও আকাশ নীল হয়, পাখিরা ঘরে ফেরে, সন্ধ্যা নামে, আবার ভোর হয়। তখন বুঝলাম, তোমাকে হারানো আমার জীবনের সমাপ্তি ছিল না।
ছিল একটি অধ্যায়ের শেষ বাক্য মাত্র। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্যটি বুঝলাম আরও পরে: তোমার কাছ থেকে ফিরে আসতে আমাকে সেই ঘৃণার পাহাড় অতিক্রম করতে হয়নি।
আমাকে শুধু তোমার বিপরীত দিকে হাঁটতে হয়েছিল। আজ তাই পাহাড়ের ওপারে কী আছে, আমি আর জানতে চাই না। তোমার নগরে আলো জ্বলে কি না, তোমার জানালায় কোনোদিন অনুতাপ এসে দাঁড়ায় কি না, তাও আর আমার প্রশ্ন নয়।
নদীটি এখনও বয়ে যায়। কিন্তু তার জলে এখন আর ঘৃণা নেই। আছে একটি দূরবর্তী ভালোবাসার স্মৃতি, কিছু হারিয়ে যাওয়া দিনের ছায়া এবং এক মানুষের নিজের কাছে ফিরে আসার দীর্ঘ ইতিহাস।
আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, সেই নদীর নাম কী? আমি বলব, তার নাম ঘৃণা নয়।
তার নাম মুক্তি। কারণ শেষ পর্যন্ত তোমাকে হারিয়ে আমি আবিষ্কার করেছি এমন একজনকে, যাকে তোমাকে ভালোবাসতে গিয়ে বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। নিজেকে।





মন্তব্য ও আলোচনা