শেষ ট্রেনের জানালায়
শহরটির নাম ছিল মেঘডুবি। নামটি সরকারি মানচিত্রে ছিল না, কিন্তু বর্ষার দিনে নদী যখন পাড় ছাপিয়ে শহরের গলিঘুঁজি পর্যন্ত নীল বিষণ্নতা ঢেলে দিত, তখন মনে হতো—শহরটি সত্যিই মেঘের নিচে ডুবে আছে। এখানে সন্ধ্যা নামে একটু আগে, শীত নামে নিঃশব্দে, আর মানুষ প্রেমে পড়ে এমনভাবে, যেন প্রেম ছাড়া তাদের জীবনে আর কোনো কাজ নেই।
মেঘডুবির পুরোনো রেলস্টেশনটি ছিল শহরের শেষ প্রান্তে। স্টেশন পেরিয়ে আরও কিছুদূর গেলে নদী, নদীর পর বিস্তীর্ণ চর, আর তারও ওপারে কুয়াশায় ঢাকা অচেনা গ্রাম। রেললাইনটি সেখানে গিয়ে থেমে থাকত না; বরং অদৃশ্য কোনো গন্তব্যের দিকে চলে যেত। তবু মেঘডুবির মানুষ বলত, এই স্টেশন থেকেই সব বিদায়ের শুরু।
অর্ণব প্রথম মাধবীকে দেখেছিল সেই স্টেশনে।
সেদিন শরৎকাল। আকাশ এত উজ্জ্বল ছিল যে, রোদের ভেতরেও যেন কাশফুলের সাদা আলো ভেসে বেড়াচ্ছিল। অর্ণব প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চটিতে বসে একটি চিঠি লিখছিল। চিঠিটি কার কাছে, সে নিজেও জানত না। বয়স তখন তেইশ। মানুষের জীবনে ওই বয়সে অনেক অপ্রেরিত চিঠি জমে থাকে—যাদের ঠিকানা নেই, অথচ প্রত্যেকটি বাক্য প্রাপকের অপেক্ষায় থাকে।
মাধবী এসে তার পাশের বেঞ্চে বসেছিল। হাতে ছিল নীল কাপড়ে মোড়া একটি ছোট বই। বইয়ের মলাটে কোনো নাম ছিল না। সে বই খুলে পড়ছিল, কিন্তু পাতাগুলো উল্টাচ্ছিল না। অর্ণব কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বুঝল, মেয়েটি পড়ছে না; বইয়ের আড়ালে সে কাঁদছে।
অর্ণব চিঠি লেখা থামিয়ে ফেলল।
“আপনি কি কাউকে বিদায় দিতে এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটি চোখ তুলল না। বলল, “না।”
“তাহলে?”
“নিজেকে।”
অর্ণব হাসতে চেয়েও হাসতে পারল না। মাধবী বইটি বন্ধ করল। বাতাসে তার চুলের কয়েকটি গোছা উড়ে এসে কপালে পড়েছিল। সে হাত দিয়ে সরাল না। যেন চুলের সঙ্গে তারও কোনো সম্পর্ক নেই।
“নিজেকে বিদায় দেওয়া যায়?” অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
“যায়। কেউ যদি খুব দূরে চলে যায়, তখন নিজের ভেতরের যে মানুষটি তার সঙ্গে ছিল, তাকে বিদায় দিতে হয়।”
সেদিনই তাদের কথার শুরু।
মাধবী ছিল মেঘডুবি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের ছাত্রী। তার বাবা ছিলেন পোস্টমাস্টার, মা দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় বিছানাবন্দি। মাধবী প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্টেশনে আসত। কখনো বই পড়ত, কখনো নদীর দিকে তাকিয়ে থাকত, কখনো এমনভাবে চুপ করে বসে থাকত যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
অর্ণব ছিল অস্থায়ী শিক্ষক। শহরের এক কোচিং সেন্টারে বাংলা পড়াত। তার স্বপ্ন ছিল লেখক হওয়া, কিন্তু স্বপ্নেরও তো সংসার থাকে। ভাড়া, বাজার, অসুস্থ বাবার ওষুধ—সবকিছু মিলে তার সাহিত্য প্রতিদিন একটু একটু করে পিছিয়ে যেত।
তবু মাধবীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর অর্ণব আবার লিখতে শুরু করল।
প্রথমে সে মাধবীকে নিয়ে লিখত না। লিখত নদী, কাশফুল, স্টেশনের লাল টালির ছাদ, সন্ধ্যার বাতি, দেরি করে আসা ট্রেন—সবকিছু নিয়ে। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্যের আড়ালে মাধবী এসে দাঁড়াত। মাধবীর চোখের মতো কালো ছিল বর্ষার রাত, তার কণ্ঠের মতো নরম ছিল শীতের কুয়াশা, তার নীরবতার মতো গভীর ছিল নদীর জল।
একদিন মাধবী বলল, “আপনি আমাকে নিয়ে লিখছেন?”
অর্ণব চমকে উঠল। “কীভাবে বুঝলেন?”
“আপনার গল্পে যত নারী আসে, তারা কেউ হাসে না। অথচ তাদের প্রত্যেকের চোখে আমার চেহারা।”
অর্ণব বলল, “আপনি কি চান, আমি আপনাকে নিয়ে লিখি?”
“না। আমাকে নিয়ে বাঁচুন। লেখা পরে হবে।”
এই কথার পর তাদের মধ্যে আর কোনো আনুষ্ঠানিকতা রইল না।
তারা একসঙ্গে হাঁটত। নদীর পাড়ে বসে মাধবী পাথর ছুড়ে জলে বৃত্ত তৈরি করত। অর্ণব বলত, “জলও কি ব্যথা পায়?”
মাধবী বলত, “জল ব্যথা পেলে ঢেউ হয়।”
মাধবী চিঠি লিখতে ভালোবাসত। প্রতিদিন দেখা হওয়ার পরও সে অর্ণবকে চিঠি দিত। কখনো এক পৃষ্ঠার, কখনো এক লাইনের। একটি চিঠিতে লিখেছিল—
“তুমি যখন পাশে থাকো, তখন তোমাকে হারানোর ভয় হয়। তুমি যখন দূরে থাকো, তখন তোমাকে পাওয়ার ভয় হয়। ভালোবাসা কি আসলে দুই ধরনের ভয়কে পাশাপাশি বসিয়ে রাখার নাম?”
অর্ণব তার উত্তর লিখেছিল—
“ভালোবাসা হলো, ভয়কে সঙ্গী করে হাঁটতে শেখা।”
তাদের প্রেমের মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতির উচ্চারণ ছিল না। তারা কখনো বলেনি, “তুমি আমার।” বরং তারা জানত, মানুষ কখনো কারও হয় না। মানুষ কেবল কিছু সময়ের জন্য অন্য মানুষের জীবনে আশ্রয় নেয়, যেমন সন্ধ্যার পাখি অচেনা গাছের ডালে বসে; তারপর ভোর হলে উড়ে যায়, কিন্তু ডালটি সারাজীবন অপেক্ষা করে থাকে।
মাধবীর বাবা তাদের সম্পর্কের কথা জেনে গিয়েছিলেন। একদিন তিনি অর্ণবকে পোস্ট অফিসের ছোট ঘরে ডেকে বললেন, “তুমি কি আমার মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে?”
অর্ণব মাথা নিচু করে বলল, “আমি চাই।”
“চাওয়া আর পারার মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা তুমি জানো?”
“জানি।”
“তোমার আয়?”
অর্ণব নীরব রইল।
পোস্টমাস্টার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “মাধবী অসুস্থ মায়ের একমাত্র ভরসা। তোমার বাবাও অসুস্থ। তোমরা দুজন ভালোবাসো, ভালো কথা। কিন্তু সংসার ভালোবাসার চেয়ে বড় জিনিস।”
অর্ণব বলল, “তাহলে কী করব?”
“দূরে চলে যাও।”
“এটাই কি আপনার পরামর্শ?”
“না। এটা আমার জীবনের অভিজ্ঞতা।”
কয়েক সপ্তাহ পর অর্ণব ঢাকায় একটি পত্রিকায় কাজ পেল। বেতন সামান্য, কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ছিল। যাওয়ার আগে সে মাধবীকে বলল, “আমি ফিরে আসব।”
মাধবী নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “ফিরে আসা কি মানুষের হাতে থাকে?”
“আমি চেষ্টা করব।”
“চেষ্টা আর ফিরে আসা এক নয়।”
“তাহলে আমাকে কী বলতে হবে?”
মাধবী এবার তার দিকে তাকাল। চোখে জল ছিল না। বরং অদ্ভুত শান্তি। “কিছু বলো না। শুধু যাও। যেটুকু সত্যি, তা নীরব থাকলেও সত্যি থাকে।”
অর্ণব চলে গেল।
ঢাকার জীবন তাকে প্রথমে গ্রাস করল। সংবাদপত্রের অফিসে দিন-রাত কাজ, ভিড়, ধোঁয়া, রাজনৈতিক খবর, মৃত মানুষের ছবি, বেঁচে থাকা মানুষের মিথ্যা বক্তব্য—সবকিছুর ভেতর দিয়ে সে হাঁটতে লাগল। রাতে বাসায় ফিরে মাধবীকে চিঠি লিখত। চিঠি শেষ করত না। কখনো লিখত, “আজ তোমার কথা খুব মনে পড়ছে।” তারপর কেটে দিত। মনে পড়া যেন তার জন্য খুব সাধারণ বাক্য; অথচ মাধবী ছিল তার জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ অনুপস্থিতি।
মাধবীও চিঠি লিখত। প্রথমদিকে নিয়মিত। পরে ব্যবধান বাড়ল। তার চিঠিগুলো ছোট হতে হতে একসময় কেবল খবরের কাগজের কাটা অংশে পরিণত হলো। কোথাও কোনো কবিতার লাইন, কোথাও মেঘডুবির নদীর জলস্তরের খবর, কোথাও অর্ণবের লেখা প্রকাশিত একটি ছোট গল্পের পাশে তার হাতের লেখা—
“তোমার গল্পে আজ একটি মেয়ে হাসছে। সে কি সত্যিই হাসছে, নাকি তুমি তাকে হাসতে শিখিয়েছ?”
অর্ণব উত্তর দিল, “সে তুমি।”
মাধবী লিখল, “আমি তো অনেকদিন হাসিনি।”
তারপর চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল।
অর্ণব প্রথমে ভেবেছিল, অভিমান। তারপর অসুখ। তারপর ভয়। মেঘডুবিতে ফোন ছিল না। সে বারবার চিঠি পাঠাল, ফিরে এল না কোনো উত্তর। এক রাতে হঠাৎ সে ছুটি নিয়ে রওনা হলো।
শহরে ফিরে সে জানতে পারল, মাধবীর মা মারা গেছেন। বাবা অবসর নিয়েছেন। আর মাধবী—সে নাকি বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে চট্টগ্রামে চলে গেছে।
অর্ণবের মনে হলো, স্টেশনের সব বাতি একসঙ্গে নিভে গেল।
পোস্টমাস্টার তাকে দেখে চুপ করে ছিলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, “মাধবী তোমার জন্য অপেক্ষা করেছিল।”
“তাহলে?”
“অপেক্ষারও তো বয়স আছে।”
“সে কি আমাকে চিঠি লিখেছিল?”
বৃদ্ধ মানুষটি ভেতর ঘর থেকে একটি টিনের বাক্স এনে তার হাতে দিলেন। বাক্সের ভেতর অর্ণবের লেখা সব চিঠি। খোলা হয়নি একটিও।
“মাধবী বলেছিল, তুমি যদি ফিরে আসো, তখন দেবে।”
অর্ণব কাঁপা হাতে একটি চিঠি খুলল। তারিখ তিন বছর আগের।
“অর্ণব, তুমি বলেছিলে ফিরে আসবে। আমি বিশ্বাস করেছিলাম। বিশ্বাসেরও একটি ঘর থাকে, জানো? সেখানে জানালা থাকে না, দরজা থাকে না। শুধু অপেক্ষা থাকে। সেই ঘরে বসে আমি প্রতিদিন তোমার পায়ের শব্দ শুনেছি। পরে বুঝেছি, শব্দগুলো আমার নিজের হৃদস্পন্দন।”
আরেকটি চিঠি—
“বাবা অসুস্থ। মায়ের চিকিৎসা বন্ধ। বাড়ির ঋণ বেড়েছে। আমাকে বিয়ে করতে বলছে সবাই। আমি রাজি হচ্ছি না। কিন্তু মানুষ যখন চারদিকে দেয়াল দেখে, তখন দরজার স্বপ্নও একসময় বিলাসিতা মনে হয়।”
শেষ চিঠিটি ছিল সবচেয়ে ছোট।
“তুমি ফিরলে আমাকে খুঁজো না। যে মাধবী তোমার অপেক্ষায় ছিল, সে আজ আর নেই। তাকে তুমি হারাওনি; সময় তাকে ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে।”
অর্ণব সেদিন রাতে স্টেশনে গিয়ে বসে রইল। শীতের কুয়াশা প্ল্যাটফর্মের বাতির চারপাশে গোল হয়ে ঝুলছিল। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছিল। রেললাইনের ওপরে চাঁদের আলো পড়ে মনে হচ্ছিল, পৃথিবী দুটো সমান্তরাল দুঃখের রেখায় বিভক্ত।
শেষ ট্রেনটি রাত বারোটায় আসার কথা। অর্ণব জানত, ট্রেনে তার কোথাও যাওয়ার নেই। তবু সে টিকিট কাটল।
ট্রেন আসার আগে স্টেশনের চায়ের দোকানের বৃদ্ধ তাকে একটি খাম দিল।
“একজন মহিলা রেখে গেছেন,” বৃদ্ধ বলল। “বছরখানেক আগে। বলেছেন, আপনি এলে দিতে।”
অর্ণব খাম খুলল। ভেতরে মাধবীর হাতের লেখা।
“তুমি যদি এই চিঠি পড়ো, তার মানে তুমি ফিরে এসেছ। আমি জানি না, তুমি আমাকে ভালোবাসতে এসেছ, নাকি নিজের অপরাধবোধকে শান্ত করতে। দুটোই মানুষের সত্যি অনুভূতি। তাই তোমাকে দোষ দিচ্ছি না।
আমার বিয়ে হয়েছে। সংসার মন্দ নয়। যে মানুষটি আমার পাশে আছে, সে আমাকে ভালোবাসে তার নিজের মতো করে। তার ভালোবাসায় তোমার মতো নদী নেই, কিন্তু আছে ছাদের নিচে নিরাপদ আলো। মানুষ শেষ পর্যন্ত আলোতেই ফিরে যায়, অর্ণব।
তুমি আমাকে ভুলে যেও না। আবার মনে রেখো না। আমাকে এমনভাবে রেখো, যেমন শরতের বিকেলকে রাখা যায়—একটি ঋতু হিসেবে, একটি গন্ধ হিসেবে, একটি অসম্পূর্ণ গানের মতো।
আর যদি কোনোদিন তোমার লেখা খুব বিখ্যাত হয়, তবে আমার কথা কোথাও লিখো না। আমি চাই না, মানুষ আমাদের প্রেমকে গল্প ভেবে পড়ুক। আমাদের প্রেম গল্প ছিল না। গল্পের মতো সুন্দর ছিল বলেই তা বাঁচেনি।”
চিঠির নিচে কোনো স্বাক্ষর ছিল না।
শেষ ট্রেন ঢুকল ধীরে ধীরে। তার আলো কুয়াশা কেটে প্ল্যাটফর্মে এসে পড়ল। অর্ণব উঠে দাঁড়াল। ট্রেনের জানালাগুলো একে একে জ্বলে উঠল। প্রতিটি জানালার ভেতর ভিন্ন ভিন্ন জীবন—কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ শিশুকে বুকে জড়িয়ে আছে, কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে এমনভাবে যেন অন্ধকারেরও কোনো উত্তর আছে।
অর্ণব ট্রেনে উঠল না।
সে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইল। ট্রেনটি ধীরে ধীরে চলে গেল। শেষ কামরার লাল আলোটি অনেকক্ষণ দেখা গেল, তারপর সেটিও অন্ধকারের ভেতর বিলীন হলো।
সেই রাতেই অর্ণব বুঝল, মানুষ সবসময় হারানো মানুষকে ফিরে পেতে চায় না। কখনো কখনো সে শুধু নিশ্চিত হতে চায়—যে ভালোবাসা একদিন তাকে বদলে দিয়েছিল, তা সত্যিই ঘটেছিল।
ভোরের আগে সে নদীর পাড়ে গেল। আকাশ তখন ফিকে হয়ে আসছে। পূর্বদিকে আলো জমছে, কিন্তু সূর্য ওঠেনি। নদীর জল নিঃশব্দে বয়ে চলেছে। অর্ণব পকেট থেকে মাধবীর চিঠিগুলো বের করল। অনেকক্ষণ ধরে তার হাত কাঁপল।
তারপর চিঠিগুলো ছিঁড়ে ফেলল না। আগুনেও দিল না। সে সেগুলো ভাঁজ করে একটি কাঁচের বোতলে রাখল, বোতলের মুখ বন্ধ করে নদীতে ভাসিয়ে দিল।
বোতলটি স্রোতে ভেসে গেল। কিছু দূর গিয়ে ঢেউ তাকে ঘুরিয়ে দিল। মনে হলো, সে ফিরে আসবে। কিন্তু না, নদী তাকে ধীরে ধীরে দূরে নিয়ে গেল।
অর্ণব হাসল।
বহু বছর পর মেঘডুবির সেই স্টেশনটি আর ছিল না। নতুন রেললাইন হয়েছে, নতুন প্ল্যাটফর্ম, নতুন দোকান। অর্ণব তখন দেশের পরিচিত লেখক। তার বই প্রকাশিত হয়, পাঠকেরা স্বাক্ষর নিতে আসে, সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়—“আপনার প্রেমের গল্প কোথা থেকে আসে?”
অর্ণব সবসময় বলত, “মানুষের কাছ থেকে।”
কেউ জানত না, তার লেখার প্রতিটি প্রেমিকার চোখে একটি মেয়ের ছায়া থাকে, যে শরতের বিকেলে নীল বইয়ের আড়ালে কাঁদছিল। কেউ জানত না, তার প্রতিটি বিচ্ছেদের শেষে নদী থাকে। কেউ জানত না, সে কখনো কোনো গল্পের শেষে লেখেনি—“তারা আবার মিলিত হলো।”
কারণ অর্ণব জানত, সব মিলন মানুষের হাতে থাকে না। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে আমাদের সম্পূর্ণ করে দিতে নয়, আমাদের ভেতরে একটি দরজা খুলে দিতে। সেই দরজা দিয়ে আমরা একদিন একা হেঁটে যাই। পেছনে তাকালে দেখি, কেউ নেই। তবু দরজাটি খোলা থাকে।
এক বর্ষার রাতে অর্ণবের কাছে একটি চিঠি এল। প্রেরকের নাম—মাধবী।
চিঠিতে লেখা—
“অর্ণব,
আজ আমার মেয়ে তোমার একটি বই পড়ছে। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘মা, তুমি কি লেখককে চেনো?’
আমি বললাম, ‘একদিন চিনতাম।’
সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘একদিন মানে?’
আমি বললাম, ‘যে মানুষকে একদিন সত্যি চেনা যায়, তাকে সারাজীবন পুরোপুরি অচেনা করা যায় না।’
তোমার বইটি পড়ে মনে হলো, তুমি ভালো আছ। এই জানাটুকুতে আমার অদ্ভুত শান্তি হলো। তোমাকে ফিরে পেতে চাই না। শুধু চাই, তুমি লিখে যাও। কিছু মানুষ একসঙ্গে থাকতে না পারলেও একে অন্যের জীবনে আলো রেখে যেতে পারে।
আমাদের আলোটি যেন নিভে না যায়।
মাধবী।”
চিঠিটি পড়ে অর্ণব জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে প্রবল বৃষ্টি। শহরের আলো ভিজে ভিজে কাঁপছে। বহু দূরে কোনো রেলগাড়ি বাঁশি বাজিয়ে অন্ধকার পেরিয়ে গেল।
অর্ণব টেবিলে ফিরে এল। সাদা কাগজ খুলল। কলম হাতে নিল।
অনেকদিন পর সে প্রথম লাইন লিখল—
“শহরটির নাম ছিল মেঘডুবি। নামটি সরকারি মানচিত্রে ছিল না…”
তারপর লিখতে লিখতে সে বুঝল, কিছু প্রেম শেষ হয় না। তারা কেবল মানুষের হাত ছেড়ে ভাষার ভেতর আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা আর কারও স্ত্রী নয়, কারও স্বামী নয়, কারও অপেক্ষা নয়। তারা হয়ে ওঠে একটি নদী, একটি জানালা, একটি শেষ ট্রেনের আলো—যা চলে যায়, অথচ অন্ধকারকে সম্পূর্ণ অন্ধকার হতে দেয় না।
সকালের আগে গল্পটি শেষ হলো।
অর্ণব কাগজের ওপর হাত রেখে অনেকক্ষণ বসে রইল। তার চোখে জল ছিল না। বুকের ভেতরও কোনো হাহাকার নেই। শুধু মনে হলো, বহু বছর ধরে যে দরজাটি খোলা ছিল, আজ সেখানে ভোর এসে দাঁড়িয়েছে।
আর ভোরেরও নিজস্ব এক ধরনের বিদায় আছে।
সে বিদায় মানুষকে কাঁদায় না।
সে মানুষকে বাঁচতে শেখায়।


মন্তব্য ও আলোচনা