কিছু অভিশাপ কপালে লেখা থাকে না, লেখা থাকে হৃদয়ের গোপন দেয়ালে। দশটি বছর ধরে তেমনই এক অভিশাপের ভার বয়ে বেড়িয়েছে হৃদয়ের সকল অলিগলিতে। সত্যের সমস্ত দরজা খোলা ছিল, প্রতারণা আর ছলনার সমস্ত চিহ্ন ছিল স্পষ্ট, তবু ক্ষমার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল মায়া, আর অপেক্ষার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিল আমার নির্বোধ ভালোবাসা। মনে হয়েছিল, সময়েরও বুঝি একদিন দয়া হবে; পাথরের বুকেও হয়তো অনুতাপের শ্যাওলা জন্মাবে।
অথচ সময় দয়া করেনি, সে করেছে রূপান্তর। যার জন্য প্রার্থনার জায়নামাযে ক্ষমার ঝড় উড়তো, অশ্রুজলে তাকে পাবার আকুতি পৌছে যেত সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত সেখানে আজ ঘৃণা জন্মেছে প্রাচীন বটবৃক্ষের শিকড়ের মতো, গভীর, বিস্তৃত, দুর্ভেদ্য। এ ঘৃণার কোনো উন্মত্ত চিৎকার নেই, নেই প্রতিশোধের রক্তচক্ষু; আছে নিঃশব্দ আগ্নেয়গিরির মতো দীর্ঘ সঞ্চয়, যার উপরিভাগ শান্ত, অথচ অন্তর্গত লাভা যেন শত বছরের যন্ত্রনার আগুন।
সবচেয়ে ভয়ংকর ঘৃণা জন্মেছে মনে হয় আমার মনে , যার জন্ম হয়েছে ভালোবাসা নামে এক অভিশাপের মৃতদেহের পাশে বসে। সেখানে অভিমান আর অভিমান নেই, বেদনা আর অশ্রু হয়ে ঝরে না; প্রতিটি স্মৃতি হয়ে ওঠে বিষমাখা কাঁটা, প্রতিটি পরিচিত শব্দে জেগে ওঠে অপমানের পুরোনো ক্ষত। বিস্মৃতির দরজায় কড়া নাড়লেও অতীত ফিরে আসে ভয়ংকর এক জল্লাদ হয়ে, যেন বিবেকের আদালতের রায় আজ বাস্তবায়ন হবে।
একসময় যে বিষয়গুলো পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ক্ষমা করা হয়েছিল, আজ সেগুলোই অভিশাপের কালো অক্ষরে নিজেদের নাম লিখে রেখেছে। যে প্রতারণাগুলোকে ভুল ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে চরিত্রের প্রতিকৃতি হিসেবে। দীর্ঘ সহিষ্ণুতা যে দুর্বলতা নয়, ক্ষমা যে নির্দোষতার সনদ নয়, আর নীরবতা যে চিরস্থায়ী আত্মসমর্পণ নয়, তা বুঝতে কখনো কখনো একটি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু পুড়িয়ে ফেলতে হয়। যা আমার হয়েছে।
আহা, মানুষের হৃদয়ও কী বিচিত্র! যে হৃদয় দ্বিচারিনীকে গভীর মমতায় আশ্রয় দিয়েছিল, আজ সেই হৃদয়ের দরজাতেই জন্ম নিয়েছে অনন্তকালের শীতলতা, যেখানে অনুতাপের আগুনও উষ্ণতা খুঁজে পায় না।
এখন আর কোনো অভিযোগের প্রয়োজন নেই। কারন অভিযোগেরও তো একটি উদ্দেশ্য থাকে, তাহলো কারও বিবেকের দরজায় পৌঁছানো। অথচ যখন ভালোবাসার চেয়ে অজুহাত বড় হয়ে ওঠে, তখন শব্দেরা ক্লান্ত হয়, যুক্তিরা নির্বাসনে যায়, আর নীরবতা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সাক্ষ্য।
এবার আমার অপেক্ষা শুধু প্রতিফলের। কোনো অভিশপ্ত ভবিষ্যতের জন্য নয়, বরং সেই অনিবার্য মুহূর্তটির জন্য, যখন নিজের কর্মের প্রতিধ্বনি মানুষের কাছে ফিরে আসে নিজেরই কণ্ঠস্বর হয়ে। তখন বাহ্যিক সাফল্যের সমস্ত আলো নিভে গিয়ে বিবেকের আয়নায় ভেসে ওঠে অবহেলিত কান্নার আওয়াজ। তখন বোঝা যায়, কিছু হৃদয় ভেঙে ফেলা সহজ, কিন্তু সেই ভাঙনের যন্ত্রনা থেকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা অসম্ভব।
সময়ের বিচার বড় অদ্ভুত। সে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেয় না, ঢাকঢোল পিটিয়ে রায় ঘোষণা করে না। কখনো কখনো বছরের পর বছর অপেক্ষা করায়, তারপর একদিন নিঃশব্দে ফিরিয়ে দেয় প্রতিটি আচরণের অর্থ, প্রতিটি অবহেলার ওজন, প্রতিটি বিশ্বাসঘাতকতার প্রকৃত মূল্য।
আর তখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা হয়ে ওঠে নিজেরই লাগামহীন অতীত।
দশ বছরের মায়া যখন ঘৃণায় রূপ নেয়, তখন বুঝতে হবে, সেখানে ভালোবাসার মৃত্যু ঘটেছে আগেই; কেবল শোকের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে এতগুলো বছর লেগেছে।
আমার হৃদয়ে কোনো বসন্তের প্রত্যাশা নেই। বাগানে বিশ্বাসের শেকড় কেটে ফেলা হয়েছে বহু আগে, সেখানে ফুল ফোটানোর অভিনয় অর্থহীন। শুধু ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে আছে একসময়ের সমস্ত কোমলতা, আর তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক নির্মম উপলব্ধি:
সবকিছুর ক্ষমা হয়তো সম্ভব, কিন্তু প্রকৃতির বিচার হতে নিজেকে বাচিঁয়ে রাখা প্রায় সম্ভব। আমার আজকের এ ঘৃণা প্রতিশোধের জন্য বেচেঁ থাকবে না। সে বেচেঁ থাকবে একটি চূড়ান্ত সত্যের সাক্ষী হয়ে।



মন্তব্য ও আলোচনা