বদলে যাওয়া মানুষের মুখ দেখে, মাঝে মাঝে আমি বরফের মতো জমে যায়। অথচ একটা সময় একটু ভালোবাসার উষ্ণতা আমাকে অ্যান্টার্কটিকা বরফের মতো গলিয়ে দিত । আর এখন নিঃশ্বাস টুকু গিলে, নিজের ভিতর নিজেকেই গুম করে ফেলি অজুত লক্ষ নিযুত কোটি বার।
একটি বিশ্বাস আর ভরসার নৌকার চড়ে আমার আর মায়ার প্রেম অর্ধযুগের বেশি সময় পার করেছে। যেদিন এক তরফা প্রেমের মহামারী থেকে বের হয়ে স্ব-জ্ঞানে ফিরে এলাম, মায়ার প্রেমের মুখোশটা খসে পড়লো আচমকা এক ধমকা হাওয়ায়। জোসনা মাখা বর্ষার রাত, দক্ষিনা হাওয়ায় জলের উপর নৌকার হেলেদুলে চলার মতোই মায়ার মনে দুলছে অন্য কেউ। জলের তলে চাঁদের ডুবসাঁতারি দেখতে দেখতে হয়তো মায়া আর নিজেকে আটকাতে পারেনি। একাকার হয়েছে দুজন।
আমি মায়াকে কয়েকবার ফোন দেওয়ার পর সে ফোনটা ধরেছে। কিন্তু আমি তাকে আর ধরতে পারিনি। জলের নিস্তব্ধ বয়ে চলা জানিয়ে দিয়েছিল ঐদিন রাতে সে হারিয়েছে তার সম্ভ্রম আর আমি হারিয়েছি প্রেমের পবিত্রতা। সারা রাত বিশ্বাস ভাঙার ঝড়ে আর ঘুমাতে পারিনি। ভোরের আলো ফুটে ওটার আগেই আমি তার বাসায় চলে যায়, মায়ার সাথে একান্ত কথা বলার জন্য। হৃদয়ের আকুলতা এতোই বেড়ে গিয়েছিল যে, তার কাছে পৌছাতে আমি বঙ্গোপসাগর ও পারি দিতে পারতাম ঐ সময়।
মনে পরে খুব কফিতে চমুক দিতে দিতে আমরা- দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানিয়ে দিতাম। কখন যে সময় চলে যেতো মায়ার হাসিতে আমি তা বুঝতেই পারতাম না। এটা আমাদের বিগত সাত বছরের অভ্যাস। কিন্তু হঠাৎ করেই মায়া বদলে গেলো। ব্যস্ততার অজুহাতে সে তার অবহেলার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে লাগলো। নতুন করে নিজেকে সাজাতে লাগলো অন্যরূপে।
আগে রূপচর্চা নয়, আমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মায়ার প্রথম কাজ ছিল, ঠোঁটে লিপস্টিক পরাটা তার পছন্দ ছিলনা। অথচ অন্যকারো ভালো লাগায় সে এখন নিয়ম করে রূপচর্চা করে, ঠোঁটে লিপস্টিক লাগায়, চুলের প্রতিও অনেক যত্নশীল। বদলে যাওয়া মায়া হয়ে উঠলো শহরের লাস্যময়ী নারী। এমন কী কবিতার ছন্দে কেউ কেউ তাকে রাঙাতে শুরু করলো। শাড়ীতে অন্যচোখে হয়ে উঠলো সে নয়নতারা। কিন্তু আমি আর তাকে সুন্দর বলতে পারিনা,তাকে সুন্দর বলতে আমার খুব কষ্ট হয়। বলতে না পারার কারণেই দুঃখ পাই আরো বেশি।
আচ্ছা, আপনারা কি বলতে পারেন কোন কারনে নারীর সৌন্দর্য ভঙ্গ হয়? তবে আমি জানি! নারীর সৌন্দর্য হলো তার সততায় এবং তার জীবন সঙ্গীর বিশ্বস্তায়। চামরা ঝুলে পরা কোনো বয়স্ক নারীর ও তার সুন্দর্যে অটুট থাকতে পারে তার সঙ্গীর স্বচ্ছ ভালোবাসায়। অথচ মায়ার রহস্যময় বদলে যাওয়া তার শরীরের প্রতি যত্নশীল হলেও ভিতরের সৌন্দর্যটা সে হারিয়ে ফেললো।
এখন ইচ্ছে হলে আমি তাকে ছুঁতে পারি, কিন্তু অশ্রুজলে হাজারো রাত বিসর্জন দিয়েও তাকে আর ধরতে পারি না। আগে আমি তাকে না ছুঁলে সে আমাকে ধরে ছাড়তো। রোগের পথ্যের মতো নিয়ম করে তার কন্ঠস্বর সারিয়ে দিতো আমার জ্বর। মায়াহীন আমার কখনো সকাল হয়নি।
মোবাইলে কথা বলতে বলতে রাত শেষ করে দেওয়া যেত দুজনের অথচ এখন তাকে ফোন দিলে ঘুমের অজুহাতে সে অন্য কানেকশনে ব্যস্ত থাকে।
প্রেমের বিচ্ছেদে ততটা বিচলিত নই আমি, যতটা বিচলিত তার রহস্যময় বদলে যাওয়ায়। মায়াকে সুখে দেখবো এই ভেবে নিজের অজান্তেই কতোবার নিজেরে স্বপ্নগুলো খুন করেছি, বিধাতার তা অজানা নয়। কিন্তু সে যেভাবে মিথ্যা অভিলাসে দ্বিচারীনি হয়ে উঠলো তা আমার হৃদয়ে ক্যান্সারের মতো এক রহস্যময় যন্ত্রনার জন্ম দিয়েছে। ভেঙে দিয়েছি আমার যত্নে রাখা বিশ্বাস। কয়েকটি দিনের ব্যবধানে জীবনের সকল স্বপ্ন লন্ডভন্ড হয়ে গেলো। বেদনার নীল প্রহরে পাথরচাপা কষ্ট বুকে নিয়ে পথচলা যে কি নিদারুন কষ্ট, প্রেমিক মাত্রই তা অনুভব করতে পারে।
এতোক্ষণ যে মায়ার কথা বলছি তার পারিবারিক নাম রাজুতি, তার সহপাঠি থেকে কর্মস্থলের সবাই তাকে এ নামেই চিনে। প্রাচুর্যের মাঝে এক প্রকার অবহেলায় বেড়ে উঠা নারী রাজুতি। গতানুগতিক প্রেম,সর্ম্পক ও জীবনধারার বাহিরে তার নিজেস্ব একটি জগত তৈরি করা ছিল। এখানে প্রবেশ করে আমার কল্পনার নারীর মতোই তাকে হৃদয়ের রানী বানিয়ে নিলাম। হাজার বছরের কল্পনার নারী যেভাবে পুরুষের হৃদয়ে ঘুরপাক খায় আমিও তার চেয়ে ভিন্ন কেউ ছিলাম না। আমার চোখে রাজুতি ছিল রোদ্রক উজ্জল ভোর,অনিন্দ্য কুসুম,সুবাসিত ফুল। তার কাজল রাঙা আখি ও লাজুক হাসিতে বার বার পরাজিত হতাম। সে ছিল মাধবী ভোরের মায়াবী সকাল,বুকের খুন দিয়ে হাজারো গুল্মে সজিব হয়েছিল হৃদয়ের বাগিচায়। আদর করে তার নামকরণ করেছিলাম “মায়া”।
বেনামী নীল প্রহর -১
👁️ 8 ভিউ↗ 0 শেয়ার💬 0 মন্তব্য




মন্তব্য ও আলোচনা