নদীর ধারে সেই বিকেলটা ছিল অন্যরকম—নরম সূর্যাস্ত, হালকা কুয়াশার আভা, আর বাতাসে নদীর স্রোতের এক অদ্ভুত সঙ্গীত। রিকসার চাকা পিচ্ছিল মাটিতে ঢেঁকুও ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম, মনে অজানা উত্তেজনা, অচেনা আগ্রহ। ঠিক তখনই রায়হানা—রাজুতির বন্ধু, শহরের পরিচিত মুখ—আমার দিকে এগিয়ে এল।
“পথিক, দেখ, আমি এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। সে রাজুতি,” বলল সে, হালকা হাসি মুখে খেলল। তার চোখে সেই সহমর্মিতা, আর আমি ভেতর থেকে বুঝতে পারলাম—আজ কিছু বিশেষ ঘটতে যাচ্ছে।
নদীর কূলের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল রাজুতি। লাল পারের শাড়ি বাতাসে হালকা দুলছে, চুলের সিল্কি রেখা কাঁধের ওপর নরমভাবে প্রসারিত। শ্যামলা গায়ের রঙ, চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লাজুক হাসি—সব মিলিয়ে এক নিঃশব্দ কবিতা যেন জীবন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। তার নাক সরু, নরম বাঁশি-রেখার মতো, ঠোঁট পাতলা, দাঁতগুলো মুক্তার মতো ঝকঝকে। হাঁটার ভঙ্গি, চোখের খানি, হেসে ওঠার মুহূর্ত—সব মিলিয়ে নদীর ধারের নীরবতা কণ্ঠহীন সুরে বাঁধা পড়ল।
“শুভ বিকেল, রাজুতি,” বললাম, মাথা হালকা নত করে।
“শুভ বিকেল। সাংবাদিকতার খাতিরে শহরের খবর নিতে এসেছ?” তার কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিক সৌন্দর্য, কিন্তু শব্দগুলো শান্ত, মৃদু।
রায়হানা আমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে হেসে বলল,
“চল, নদীর ধারে হেটে হাঁটে কফি খাও। এই পরিচয়টা সুন্দর হবে।”
নদীর কূল ধরে আমরা হাঁটতে হাঁটতে এক নিঃশব্দ বন্ধন তৈরি করলাম। ঢেউয়ের হালকা আছড়ে পড়া, পাখিদের কলরব, বাতাসের নরম ছোঁয়া—সব মিলিয়ে যেন আমাদের চারপাশে এক আলাদা জগত তৈরি হলো।
ক্লাসে আমরা একে অপরকে ভেবেছিলাম তথ্য-চর্চার মাধ্যম হিসেবেই। সাংবাদিকতার খাতিরে আমরা নানা বিষয়ে আলোচনা করতাম—শহরের খবর, সাহিত্য, সমসাময়িক ঘটনা, বিদেশি শিক্ষার প্রক্রিয়া। রাজুতির বক্তব্যে ছিল একটি অন্তর্দৃষ্টি, যেখানে শুধু তথ্যের আদান-প্রদানের বাইরে তার ভেতরের সৌন্দর্যও ফুটে ওঠে।
ক্লাস শেষ হলে আমাদের পরিচয় ফেসবুক মেসেঞ্জারে ঘরে ঘরে বিস্তৃত হলো। ছোট ছোট বার্তা, হালকা হেস্যরস, শিক্ষণীয় তথ্য, কখনো চমৎকার ব্যঙ্গ—সব মিলিয়ে আমাদের নীরব বন্ধন আরো গভীর হলো। বার্তাগুলোতে ছিল অদ্ভুত রোমাঞ্চ, চোখের দেখা ছাড়া অনুভূতির বিনিময়।
একদিন ঠিক করলাম শহরের বাইরে, নদীর ধারে এক দিন কাটাবো। রিকসা থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে সেই বিকেল শুরু হলো। নদীর তীরে নরম বালুচরের ওপর পা পড়ছে, বাতাসে নদীর স্রোতের সুর, পাখিদের হাসি—সব মিলিয়ে একটি অন্য বাস্তবতা।
রাজুতি লাল শাড়িতে, চোখে কাজল, চুল সিল্কি—মাঝে মাঝে বাতাসে দুলে তার চুলের রেখা যেন নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে নাচছে। তার চোখের গভীরতা, ঠোঁটের হালকা হাসি, হাঁটার ভঙ্গি—সব মিলিয়ে নদীর ধারের নীরবতা যেন কবিতার ছন্দ হয়ে গেছে।
আমরা ধীরে ধীরে নদীর ধারে হাঁটছিলাম। সে হেসে বলল,
“পথিক, নদীর ঢেউও আমাদের মতোই কথা বলতে চায়।”
আমি বললাম,
“হয়তো। কিন্তু আমাদের কানে শুধু নীরবতার সুর শোনা যায়।”
সে হেসে নদীর দিকে তাকালো, হালকা ধোঁয়াটে আকাশ আর সূর্যাস্তের আলো যেন তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে। সেই দৃশ্য—লাল শাড়ি, নরম বাতাস, চোখের মাধুর্য—আমার ভেতর অজানা এক আবেগের জন্ম দিল।
নদীর ধারের নরম ঘাসে বসে আমরা এক কাপ কফি খেলাম। তার হাতের ভঙ্গি, চোখের খানি, হেসে ওঠার মৃদু সুর—সব মিলিয়ে অনুভূতির এক নিঃশব্দ আবহ তৈরি হলো। সে বলল,
“পথিক, তুমি কি জানো, নদীও আমাদের মতোই কৌতূহল রাখে?”
আমি হেসে বললাম,
“তাহলে আমরা দু’জনে নদীর সঙ্গে কথা বলছি, না?”
হঠাৎ তার চোখে এক ধরনের শান্তি। নদীর স্রোত, বাতাস, লাল শাড়ি—সব মিলিয়ে এক চিত্র তৈরি হলো। সে হেসে হাত ঢেলে নদীর ঢেউয়ে স্পর্শ করল। আমি দূরে থেকে তাকিয়ে থাকলাম, যেন কোনো শিল্পীর ছবি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
একটা মুহূর্তে, রাজুতি হঠাৎ বলল,
“চল, নদীর ধারে ছোট্টো ঘুরে আসি।”
আমি বললাম,
“ঠিক আছে। তবে মনে রাখবে, আমি কোনো বিশাল খরচ করতে পারি না। শুধু হাঁটাহাঁটি, নীরবতা আর গল্প—এটাই আমার সামর্থ্য।”
সে হেসে বলল,
“ঠিক আছে, তবে শুধু হাঁটাহাঁটি হলেও মনে থাকবে। নদীর ঢেউ, বাতাস, আলো—সব আমাদের। আমাদের মুহূর্ত।”
নদীর ধারের হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছালাম একটি কৃষি প্রজেক্টের কাছে। নদীর কূলে নরম মাটি, শস্যের ঘ্রাণ, সূর্যাস্তের লাল আভা। রাজুতি ধীরে ধীরে শুয়ে বসল। লাল শাড়ির দুলন, চুলের সিল্কি রেখা হাওয়ায় দুলছে। চোখের গভীরতা, হাসির মৃদুতা—সব মিলিয়ে যেন জীবন একটি কবিতার মতো দাঁড়িয়ে।
আমি এক কোণে বসে তাকালাম। সে হেসে বলল,
“পথিক, কি সুন্দর শান্তি।”
আমি বললাম,
“হ্যাঁ, এই মুহূর্তটা যেন থেমে আছে।”
সে হেসে মাথা ঝুঁকালো,
“নদীর ঢেউ, সূর্যাস্ত, বাতাস—সব মিলিয়ে এক কবিতা।”
আমার ভেতরে অজানা এক আবেগ জন্ম নিল। নদীর ধারের লাল শাড়ি, চোখের কাজল, চুলের সিল্কি রেখা, হাসি—সব মিলিয়ে ভেতরের কবিতার ছন্দ তৈরি হলো।
ফেসবুক মেসেঞ্জারে আমরা পরে সেই দিনের স্মৃতি ভাগাভাগি করলাম। কফি খাওয়ার সময়ের নীরবতা, নদীর ধারে হাঁটার অনুভূতি—সব মিলিয়ে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ল।
সেই বিকেল, নদীর স্রোত, বাতাস, লাল শাড়ি—সব মিলিয়ে সম্পর্কের সূক্ষ্ম সেতু তৈরি করল। আমি ভেতরে অনুভব করলাম, রাজুতি কেবল সুন্দরী নয়, তার সৌন্দর্য এবং নীরবতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
আমাদের ছোট ছোট বার্তাবিনিময়, নদীর ধারের এক দিন, কফির কাপ—সব মিলিয়ে সম্পর্কের প্রথম সূক্ষ্ম ভিত্তি গড়ে উঠল। সেই অনুভূতি, নদীর নীরবতা, লাল শাড়ির দুলন, চুলের সিল্কি রেখা—সব মিলিয়ে একটি নিঃশব্দ কবিতা হয়ে দাঁড়ালো।
এই পরিচয়, এই একদিনের হাঁটা, নদীর ধারে থাকা—সব মিলিয়ে আমার ভেতরে অম্লান অনুভূতি তৈরি করল। সেই অনুভূতিটাই পরবর্তী সময়ের আবেগ ও সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে স্থির হলো।
এভাবেই পরিচয়, ক্লাসের আলাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জারের বার্তা এবং একদিনের ঘুরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের সম্পর্কের সূক্ষ্ম সেতু গড়ে তুলল। নদীর ধারে লাল শাড়ি দুলন, চোখের গভীরতা, হাসির মৃদুতা—সব মিলিয়ে আমার অন্তরে একটি নীরব, কিন্তু প্রবল আবেগ তৈরি করল।
বেদনার নীল প্রহর
👁️ 17 ভিউ↗ 5 শেয়ার💬 0 মন্তব্য




মন্তব্য ও আলোচনা