প্রচ্ছদ সমাজ লিখুন ফটোকার্ড দিনলিপি প্রোফাইল

বেদনার নীল প্রহর পর্ব-২

👁️ 6 ভিউ0 শেয়ার💬 0 মন্তব্য

শহরের এক প্রান্তে, পুরোনো দিনের আভিজাত্য আর নতুন সময়ের প্রাচুর্য মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মায়াদের বাড়ি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো এক বিস্মৃত যুগের স্মৃতি এখনও সেখানে নিঃশব্দে বেঁচে আছে। লাল ইটের বিশাল দোতলা বাড়ি, সামনে উঁচু লোহার গেট, গেট পেরোলেই প্রশস্ত উঠান—যেখানে বিকেলের আলো এসে থমকে দাঁড়ায়। বাড়ির চারপাশে নানা রকম ফুলগাছ, আম, কাঁঠাল আর শিরীষের পুরোনো গাছগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন বহু বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে এক ধরনের ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে। বলা হয়, মায়াদের দাদার আমল থেকেই এই পরিবার এলাকায় প্রভাবশালী। জমিজমা, ব্যবসা-বাণিজ্য আর সামাজিক মর্যাদার কারণে তাদের নাম উচ্চারণ করলেই মানুষ এক ধরনের শ্রদ্ধা মিশ্রিত দূরত্ব অনুভব করে। বাড়ির পুরোনো বারান্দাগুলোতে এখনও সেই সময়ের স্থাপত্যরীতি টিকে আছে—মোটা স্তম্ভ, লোহার কারুকাজ করা রেলিং আর দীর্ঘ করিডোর। বিকেলের দিকে সূর্যের আলো যখন বারান্দার মেঝেতে পড়ে, তখন ছায়া আর আলো মিলিয়ে সেখানে এক অদ্ভুত নকশা তৈরি হয়।
বাড়ির ভেতরের পরিবেশও অনেকটা সেই পুরোনো দিনের মতোই। বড় ড্রয়িংরুমে ভারী কাঠের আসবাব, দেয়ালে টাঙানো পুরোনো ছবিগুলো যেন পরিবারের গৌরবের ইতিহাস বলে যায়। ছবিগুলোর মধ্যে আছে সাদা-কালো ফ্রেমে বাঁধানো পূর্বপুরুষদের প্রতিকৃতি—কেউ জমিদারী পোশাকে, কেউ বা শহরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বেশে। সেই ছবিগুলো যেন এই বাড়ির মানুষদের মনে করিয়ে দেয়, তারা একটি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করছে।
মায়াদের পরিবারে অর্থের অভাব কোনোদিন ছিল না। বাড়ির প্রতিটি আয়োজনেই সেই প্রাচুর্যের ছাপ স্পষ্ট। অতিথি এলে আপ্যায়নের আয়োজন হয় জাঁকজমকপূর্ণভাবে। বড় বড় ডাইনিং টেবিলে সাজানো থাকে নানা রকম খাবার, যেন আতিথেয়তার মধ্যেই পরিবারের মর্যাদা প্রকাশ পায়। উৎসবের সময় বাড়িটা আলো আর মানুষের কোলাহলে ভরে ওঠে।
কিন্তু এই ঐশ্বর্যের মাঝেও কিছু অদ্ভুত শূন্যতা লুকিয়ে থাকে।
পরিবারে সন্তান সংখ্যা কম নয়। বড় মেয়ে, মেজো মেয়ে, ছোট মেয়ে আর একমাত্র ছেলে—এই চারজনকে ঘিরেই সংসারের কেন্দ্র। তবু সবার ভেতরে যেন অদৃশ্যভাবে ভাগ হয়ে আছে মনোযোগের পরিধি।
বড় মেয়ের দিকে পরিবারের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। সে যেন এই বাড়ির গর্ব। পড়াশোনা, ব্যবহার আর সামাজিক পরিমণ্ডলে তার উপস্থিতি পরিবারকে সম্মান এনে দেয়। তাই তাকে ঘিরে পরিবারের যত্ন আর মনোযোগও বেশি।
অন্যদিকে ছোট ছেলেটি এই পরিবারের একমাত্র পুত্র হওয়ায় তার জন্য আদর আর স্নেহের কোনো কমতি নেই। বাড়ির প্রবীণ সদস্যরা তাকে ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখে। তার ছোট ছোট ইচ্ছেও অনেক সময় গুরুত্ব পায়।
এই দুই মেরুর মাঝখানে যে মানুষটি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে, সে হলো মেজো মেয়ে—রাজুতি।
এই বাড়িতে তার উপস্থিতি যেন সবসময় ছিল, অথচ তাকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ আলোচনার জন্ম হয় না। বড়দের গর্ব আর ছোটদের আদরের ভিড়ে মেজো মেয়েটি অনেক সময় নিজেই নিজের অস্তিত্বকে গুটিয়ে নেয়।
রাজুতি সেই নীরবতার ভেতরেই বড় হয়েছে।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য ও আলোচনা

0 মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনার মতামত দিয়ে আলোচনার শুরু করুন।