প্রচ্ছদসমাজলিখুনফটোকার্ডপথিকটিভিপ্রোফাইল

কংক্রিটের জীবন থেকে তিতাসের বুকে ফেরা

👁️ 28 ভিউ1 শেয়ার💬 0 মন্তব্য

শহর আমাদের বেঁচে থাকতে শেখায়, কিন্তু কখনো কখনো বেঁচে থাকার অনুভূতিটাই কেড়ে নেয়। প্রতিদিন একই ঘড়ির কাঁটা, একই রাস্তা, একই কংক্রিটের দেয়াল, একই ব্যস্ত মুখের ভিড়। চারদিকে এত মানুষ, অথচ মানুষের জন্য মানুষের সময় ক্রমশ কমে আসে। জীবনটা আজকাল ফরমালিনে ডুবিয়ে রাখা কোনো ফলের মতো হয়ে গেছে, দেখতে সতেজ, ভেতরে স্বাদহীন।

এমন এক যান্ত্রিক জীবন থেকে হঠাৎ একদিন মুক্তির ডাক এল তিতাসের কাছ থেকে। কবি শাহ মোহাম্মদ সানাউল হকের আন্তরিক আমন্ত্রণে সেই ডাকেই সাড়া দিলাম। মনে হলো, বহুদিন পর কেউ শহরের বদ্ধ জানালাটা খুলে দিয়ে বললেন, চলো, আজ কিছুক্ষণ নদীর কাছে বসি; দেখি জল এখনো মানুষের ক্লান্তি বুঝতে পারে কি না।

 

তবে এ যাত্রা শুধু নদী দেখার ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল কবিতা, সাহিত্য, নাটক, সংগীত, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মানুষদের এক আশ্চর্য মিলনযাত্রা। তিতাসের বুক হয়ে উঠেছিল একটি চলমান সাহিত্যসভা, আর নৌকাটি হয়ে উঠেছিল আমাদের ছোট্ট এক সাংস্কৃতিক বাংলাদেশ।

আমাদের সঙ্গে ছিলেন উচ্চশিক্ষা ও মননের জগতের মানুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ। ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনের পরিচিত মুখ, সাহিত্য একাডেমির সভাপতি কবি জয়দুল হোসেন এবং অদ্বৈত মল্লবর্মণ স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির। তাঁদের উপস্থিতিতে তিতাসের জলযাত্রা  স্থানীয় ইতিহাস, শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার এক জীবন্ত সেতুবন্ধ হয়ে উঠেছিল।

ঢাকা থেকেও এসেছিলেন একঝাঁক কবি, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, নাট্যজন ও সংস্কৃতিকর্মী। তাঁদের প্রত্যেকের উপস্থিতি নৌকার একেকটি জানালা খুলে দিচ্ছিল সাহিত্য ও শিল্পের ভিন্ন ভিন্ন আকাশে।

 

ছিলেন কথাশিল্পী মনি হায়দার, যাঁর কথার ভেতরেও যেন গল্পের আলাদা এক নদী বয়ে চলে। কবি শিমুল সালাউদ্দিনের প্রাণবন্ত উপস্থিতি আড্ডায় যোগ করেছিল অন্যরকম উচ্ছ্বাস। কবি বকুল আশরাফ, কবি ও প্রাবন্ধিক ফরিদ আহমেদ দুলাল এবং কবি ও প্রাবন্ধিক বাবুল আনোয়ারের সান্নিধ্যে নদীর বুকের কথোপকথন কখনো হয়ে উঠছিল সাহিত্য, কখনো জীবন, কখনো সময় ও সমাজের পাঠ।

ছিলেন নাট্যজন মাহফুজা হিলালী। কথাসাহিত্যের নিজস্ব ভুবন নিয়ে ছিলেন নূর কামরুন্নাহার। কবিতার কোমল ও অনুভবী জগতের প্রতিনিধি হয়ে ছিলেন কবি মারুফা জাহান মুক্তি, কবি আফরিন ও কবি ইসমুনাক। গল্পের মানুষেরা  নদীর গল্পের সঙ্গে নিজেদের গল্প মেলাতে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন গল্পকার তাহমিনার কুরাইশি, গল্পকার রোকেয়া ইসলাম ও গল্পকার ইয়াসমিন।

 

এই সাহিত্যিক যাত্রায় শিশু-কিশোরদের স্বপ্ন ও সংস্কৃতির কথাও অনুপস্থিত ছিল না। অংকুর শিশু-কিশোর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আনিসুল হক রিপনের উপস্থিতি সেই জায়গাটিকে আরও অর্থবহ করে তুলেছিল। আর নদী, কবিতা ও মানুষের এই মিলনমেলায় সুরের আবেশ নিয়ে ছিলেন কণ্ঠশিল্পী জয়নাল আবেদীন, সোহেল রানাসহ আরও অনেকে।

এ যেন কেবল কয়েকজন মানুষের একসঙ্গে নৌকায় ওঠা নয়। মনে হচ্ছিল, সাহিত্যের নানা শাখা সেদিন এসে একই নদীতে মিলেছে। আর সবাইকে নিজের বিশাল বুকে জায়গা দিয়ে তিতাস নির্বিকারভাবে বয়ে চলেছে।

নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। দুই পাশে গ্রাম। কোথাও সবুজের গায়ে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে গাছ, কোথাও নদীর দিকে নেমে গেছে সরু মাটির পথ। দূরের বাড়িগুলোকে মনে হয় প্রকৃতি নিজের হাতে এঁকে রেখেছে। মাথার ওপর আকাশ এত বিশাল যে শহরে থাকতে আমরা আকাশের কতখানি হারিয়ে ফেলেছি, তা হঠাৎ টের পাই।

শহরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে হয় টুকরো টুকরো করে। তিতাসের বুকে এসে আকাশ পাওয়া যায় সম্পূর্ণ।

 

আর এই সম্পূর্ণ আকাশের নিচে যখন কবি, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, নাট্যজন, কণ্ঠশিল্পী ও সংস্কৃতির মানুষেরা পাশাপাশি বসেন, তখন একটি সাধারণ নৌকাভ্রমণ আর সাধারণ থাকে না। কথার সঙ্গে কথা মেশে, স্মৃতির সঙ্গে স্মৃতি, গানের সঙ্গে বাতাস, কবিতার সঙ্গে নদী।

তিতাস তখন আর শুধু নদী থাকে না। সে হয়ে ওঠেছিল আমাদের সকলের ভেতরে জমে থাকা একটি দীর্ঘ কবিতা।

এই ভ্রমণের সবচেয়ে মায়াবী অধ্যায় হয়ে উঠল অদ্বৈত মল্লবর্মণের স্মৃতিবাহী মালোপাড়ার ছোট ছোট শিশুদের অংশগ্রহণ। যে জনপদের জীবন, দুঃখ, ভালোবাসা ও সংগ্রাম বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী অদ্বৈত মল্লবর্মণের সৃষ্টিতে মহাকালের সম্পদ হয়ে আছে, সেই মাটির শিশুদের হাসি, নাচ আর গান যেন অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি করল।

শিশুরা নাচল, গান গাইল, হাসল। তাদের চোখে নদীর মতোই স্বচ্ছ আনন্দ। সেখানে শহরের হিসাব নেই, লাভ-ক্ষতির অঙ্ক নেই, আগামীকাল নিয়ে উদ্বেগ নেই। আছে শুধু এই মুহূর্তটুকু প্রাণভরে বেঁচে থাকার সহজ ক্ষমতা।

তাদের আনন্দ দেখতে দেখতে মনে হলো, সভ্যতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পাঠ্যপুস্তকে লেখা নেই। কখনো কখনো একটি নদীপাড়ের শিশুও আমাদের শিখিয়ে দিতে পারে, কীভাবে কোনো কারণ ছাড়াই আনন্দিত হতে হয়।

উদাস দুপুরে তিতাসের জলে হাত ডুবিয়ে মনে হলো, কতদিন জলের সঙ্গে এমন করে কথা বলা হয়নি! শহরে জল পাই কলের মুখে, বোতলে, গ্লাসে। সেখানে জলের কোনো গল্প নেই। অথচ নদীর জল জীবন্ত। সে ছুটে যায়, ফিরে আসে, পায়ের কাছে ঢেউ তুলে আবার দূরে সরে যায়। কখনো মনে হয় অভিমানী প্রেমিকা, কখনো মা, কখনো বহুদিনের পুরোনো বন্ধু।

ছলছল জল আর স্নিগ্ধ বাতাস দেখতে দেখতে আমরা এসে থামলাম নবীনগরের একটি রিসোর্টে। নৌকা থেকে নেমে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। সে শ্বাস শুধু বাতাসের ছিল না। মনে হলো, তিতাসকেই বুকের ভেতর টেনে নিচ্ছি।

দু’হাত প্রসারিত করে আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে করছিল। বিকেল গড়িয়ে ফেরার সময় হলো। পশ্চিম দিগন্তে সূর্য তখন তার সমস্ত তেজ কোমল করে লাল আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। নদীর জলেও সেই রঙের আগুন। পেছনে পড়ে থাকছে গ্রাম, গাছ, ঘাট, শিশুদের হাসি আর দুপুরের গান। অথচ কিছুই যেন সত্যিকার অর্থে পেছনে পড়ে থাকছে না। সবকিছু একটু একটু করে আমাদের ভেতরে জমা হয়ে যাচ্ছে।

সন্ধ্যা নামল পৃথিবীতে। গ্রামের ঘরে ঘরে আলো জ্বলতে শুরু করল। পাখিরা ফিরে গেল নীড়ে। দূর থেকে ভেসে আসা মানুষের কণ্ঠও ক্রমে ক্ষীণ হয়ে গেল। আমাদের নৌকা তখন তিতাসের বুক চিরে ফিরছে।

এরই মধ্যে আকাশে দেখা দিল জোছনা। মনে হলো, চাঁদ বুঝি আকাশ ছেড়ে তিতাসের বুকে নেমে এসেছে। জলের ওপর জোছনা ভেঙে ভেঙে পড়ছে। ঢেউ এসে সেই আলোকে টুকরো করছে, আবার জোড়া লাগাচ্ছে। পুবালী বাতাস শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। নৌকার নিচে ছলছল জল, মাথার ওপর জোছনার আকাশ, চারপাশে কবি-মানুষের মুগ্ধ উপস্থিতি।

সেই মুহূর্তে মনে হলো, সুখের সংজ্ঞা বোধ হয় আমরা অকারণেই জটিল করে ফেলেছি। সুখ হয়তো এই তো।

একটি নৌকা।

একটি নদী।

কয়েকজন কবি ও প্রিয় মানুষ।

দূরের একটি গ্রাম।

পুবালী বাতাস।

আর জলের ওপর ভেঙে পড়া এক টুকরো চাঁদ।

মানুষ সারাজীবন সুখের জন্য কত কিছু সংগ্রহ করে। অথচ প্রকৃতি কোনো মূল্য ছাড়াই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সৌন্দর্যগুলো আমাদের সামনে বিছিয়ে রেখেছে। একটি সূর্যাস্তের কোনো টিকিট লাগে না, জোছনার জন্য কোনো বিল দিতে হয় না, নদীর বাতাস মানুষের পদমর্যাদা দেখে শরীর ছোঁয় না।

প্রকৃতির কাছে সবাই কেবল মানুষ। তিতাসের বুকে বসে সেই সহজ সত্যটিই নতুন করে বুঝলাম।

জীবন শুধু কর্ম নয়, দায়িত্ব নয়, অর্থ উপার্জনের অন্তহীন প্রতিযোগিতাও নয়। জীবন মানে কখনো কখনো থেমে যাওয়া। একটি নদীর পাশে বসা। শিশুর হাসি দেখা। পাখির ঘরে ফেরা দেখা। সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখা। কবির সঙ্গে কথা বলা। গান শোনা। আর নিজের বুকের ভেতর বহুদিন ধরে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটিকে ডেকে তুলে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া।

প্রকৃতি আমাদের ডাকে-  কংক্রিটের পৃথিবী যখন তোমাকে ক্লান্ত করে দেবে, আবার এসো।মানুষের ভিড়ে যখন নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে, আবার এসো। আমি জল হয়ে থাকব, বাতাস হয়ে থাকব, জোছনা হয়ে থাকব। আর তোমাকে মনে করিয়ে দেব, জীবনের সবটুকু এখনো যান্ত্রিক হয়ে যায়নি। পৃথিবীতে এখনো নদী আছে, জোছনা আছে, কবিতা আছে, মানুষ আছে। আর তাই, জীবন এখনো সুন্দর।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য ও আলোচনা

0 মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনার মতামত দিয়ে আলোচনার শুরু করুন।