একসময় জ্ঞান অর্জনের প্রধান মাধ্যম ছিল কাগজ-কলম, শিক্ষক ও গ্রন্থাগার। আজ সেই জ্ঞান মানুষের হাতের মুঠোয়—একটি স্মার্টফোন, কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের অসংখ্য গ্রন্থ, গবেষণা ও শিক্ষার দুয়ার খুলে গেছে।ফলে প্রযুক্তি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি জ্ঞানার্জনের শক্তিশালী হাতিয়ার।
কখনো কখনো প্রযুক্তিকে দ্বীনি জ্ঞান বা পড়াশোনার প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা হয়। অথচ প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নয়; এর ব্যবহারই তাকে কল্যাণকর বা ক্ষতিকর করে তোলে। ইসলাম জ্ঞানার্জনকে উৎসাহিত করেছে এবং মানুষের কল্যাণে উপকারী জ্ঞান অর্জনের পথকে কখনো সংকীর্ণ করেনি।
পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম নাজিল হওয়া আয়াতগুলোর সূচনাই হয়েছে জ্ঞান ও পাঠের আহ্বানে, ‘পড়ো তোমার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১)
এরপর আল্লাহ বলেন, ‘যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন; মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ৪-৫)
এখানে ‘কলম’ জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিস্তারের একটি মাধ্যম হিসেবে এসেছে। অতএব যুগের পরিবর্তনে জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিতরণের মাধ্যম পরিবর্তিত হওয়া ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী নয়।
একসময় কলম ও কাগজ ছিল প্রধান মাধ্যম; আজ কম্পিউটার, ই-বুক, অনলাইন লাইব্রেরি ও ডিজিটাল প্রযুক্তিও জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) জ্ঞান অন্বেষণের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচুতে তুলে ধরেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৬৪১)
এখানে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। ফলে কোনো আধুনিক প্রযুক্তি যদি মানুষকে উপকারী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেয়, তাহলে তা যথাযথ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা জ্ঞানচর্চারই একটি মাধ্যম হতে পারে।
প্রযুক্তি হতে পারে দ্বীনি জ্ঞানচর্চার সহায়ক
আজ একজন শিক্ষার্থী ঘরে বসেই কোরআনের তাফসির, হাদিসের ব্যাখ্যা, আরবি ভাষা, ইসলামী ইতিহাস কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পড়তে পারেন। একজন আলেম ডিজিটাল লাইব্রেরির মাধ্যমে হাজারো দুর্লভ কিতাব খুঁজে পেতে পারেন। অনলাইন ক্লাস ও ভিডিও লেকচারের মাধ্যমে দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীরাও যোগ্য শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষকরে দ্বীনি বিষয় আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সহজ সমাধান হলো, একজন প্রাজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য আলেমের শরণাপন্ন হওয়া। কারণ ইন্টারনেটে সঠিক জ্ঞানের পাশাপাশি ভুল তথ্যও ছড়িয়ে আছে। তাই কোরআন-হাদিসের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ, আলেম ও গবেষণার সূত্র অনুসরণ করা জরুরি।
প্রযুক্তি যেন বিভ্রান্তির কারণ না হয়
প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—এটি মানুষকে জ্ঞানী করার পাশাপাশি অজ্ঞতার মধ্যেও ডুবিয়ে দিতে পারে। একই মোবাইল ফোন দিয়ে কেউ কোরআন পড়তে পারে, আবার কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থহীন বিনোদনে ডুবে থাকতে পারে। একই ইন্টারনেট একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্বমানের জ্ঞানের কাছে পৌঁছে দিতে পারে, আবার মিথ্যা তথ্য ও অনৈতিকতার দিকেও টেনে নিতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হওয়া উচিত—উদ্দেশ্য হবে কল্যাণ, ব্যবহার হবে সংযত, আর তথ্য হবে যাচাইকৃত। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৩)
অর্থাৎ প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, যোগ্য আলেম ও বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না। প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জনের সহায়ক হতে পারে; কিন্তু তা অভিজ্ঞ শিক্ষক ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞানের বিকল্প নয়।
ইসলামী ইতিহাস প্রযুক্তিবান্ধব জ্ঞানচর্চার সাক্ষী
মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে মুসলিম মনীষীরা তাঁদের সময়ের উন্নত জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন। কাগজের ব্যবহার, গ্রন্থ সংকলন, মানমন্দির, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মানচিত্রবিদ্যার বিকাশে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান ইতিহাসে সুপরিচিত। তাঁরা জ্ঞানকে ভয় করেননি; বরং জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছেন। তাই আজকের মুসলিম তরুণদেরও প্রযুক্তি থেকে দূরে সরে যাওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তিকে নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজে লাগানো উচিত।
প্রযুক্তির ব্যবহার হোক আমানতদারিতার সঙ্গে
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের মনে রাখতে হবে—সময়ও আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাই অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং, আসক্তি ও অনর্থক বিনোদন যেন জ্ঞানচর্চা, ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের পথে বাধা না হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ইসলামি বক্তব্য, হাদিস বা তথ্য পাওয়া গেলেই তা যাচাই ছাড়া প্রচার করা উচিত নয়। তাই আমাদের হাতে থাকা মোবাইলটি যেন শুধু বিনোদনের যন্ত্র না হয়ে কোরআন-হাদিস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, ইতিহাস ও প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনের একটি জীবন্ত পাঠাগারে পরিণত হয়। এটাই প্রত্যাশা।



মন্তব্য ও আলোচনা