প্রিয়াহীন শ্রাবণ
শ্রাবণের আকাশ আজ এক বিধবা সমুদ্র,
বুকের সমস্ত নীল হারিয়ে
কালো মেঘের শাড়ি পরে বসে আছে বিষণ্নতার ঘাটে।
দূরে কোথাও বাজ পড়লো মনে হয়,
কেউ অন্ধকারের বুক চিরে
তোমার নামটি লিখে আবার মুছে ফেলছে।
বৃষ্টি নামে।
নিঃশব্দে, অবিরাম, অভিমানীর চোখের মতো।
জানালার কাঁচ বেয়ে নেমে আসে অসংখ্য জলরেখা,
প্রতিটি রেখায় তোমার মুখের একেকটি স্মৃতি,
প্রতিটি ফোঁটায় একেকটি অসমাপ্ত বিদায়।
আজ কেয়া ফুলের গন্ধেও বিষাদ।
কদমের গোল মুখে জমে আছে
বহুদিনের না-বলা কোনো প্রেমের পাণ্ডুলিপি।
বাতাস যখন কদমের ডালে হাত রাখে,
মনে হয়—
প্রকৃতিও বুঝি আজ আমাকে জিজ্ঞেস করছে,
“সে কোথায়?”
আমি কোনো উত্তর দিই না।
শুধু দূরের জলমগ্ন মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকি।
সেখানে বৃষ্টিরা ঘাসের শরীরে
হাজার বছরের কোনো গোপন মন্ত্র লিখে যাচ্ছে,
আর ব্যাঙের ডাকের ভেতর দিয়ে
রাত ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে
এক অতল প্রাচীন জাদুর দেশ।
কখনো মনে হয়,
তুমি এইমাত্র এসে দাঁড়াবে দরজায়।
ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে পড়বে শ্রাবণ,
চোখের কোণে থাকবে মেঘের মতো মায়া,
আর তুমি বলবে,
“এতদিন কোথায় ছিলে?”
আমি তখন হয়তো হাসব,
যেমন শুকনো নদী বর্ষার প্রথম জলে হাসে।
কিন্তু দরজা খোলে না।
শুধু হাওয়া আসে।
তোমার অনুপস্থিতির মতো ঠান্ডা,
তোমার স্মৃতির মতো দীর্ঘ।
রাত বাড়ে।
মেঘের গর্ভে চাঁদটি
এক মৃত রাজ্যের নির্বাসিত রাজপুত্রের মতো
আলোহীন ঘুমিয়ে থাকে।
আর আমি একা বসে শুনি—
টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ,
দূরের বাঁশবাগানে বাতাসের কান্না,
কদমপাতায় জল ঝরার ক্ষীণ সুর।
এই পৃথিবীতে কত বৃষ্টি আসে,
কত নদী ভরে ওঠে,
কত কেয়া ফুল ফোটে,
কত কদমের গন্ধে রাত মাতাল হয়;
শুধু আমার ঘরের ভেতর
একটি ঋতু কোনোদিন আসে না।
তোমার ঋতু।
তাই শ্রাবণ এলেই
আমি আকাশের দিকে তাকাই না আর।
কারণ জানি,
মেঘ যতই নামুক,
বৃষ্টি যতই পৃথিবী ভাসাক,
কোনো বর্ষাই ফিরিয়ে দিতে পারে না
হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষকে।
তবু বৃষ্টি নামে।
কেয়া দোলে।
কদম ফোটে।
নদী উথলে ওঠে।
আর আমার একাকী জানালার পাশে
একটি পুরোনো হৃদয়
শ্রাবণের শেষ বৃষ্টির মতো
তোমাকে ভালোবেসেই
ধীরে ধীরে
অন্ধকার হয়ে যায়।